জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসমুক্তকরণে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

মাহতাব মুহাম্মদ

মতামত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর দুই দশক ধরে রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও দুর্বৃত্তায়নে সন্ত্রাসীদের এক ভয়ংকর ‘সমান্তরাল রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। যৌথ বাহিনীর

2026-06-03T14:44:26+00:00
2026-06-03T14:44:26+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসমুক্তকরণে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
মাহতাব মুহাম্মদ
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ২:৪৪ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর দুই দশক ধরে রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও দুর্বৃত্তায়নে সন্ত্রাসীদের এক ভয়ংকর ‘সমান্তরাল রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। যৌথ বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে তাদের চেইন অব কমান্ডে আঘাত লাগলেও এলাকাটি এখনও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কিছু দিন আগেও র‌্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা করেছে সন্ত্রাসীরা। জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে অল্পবিস্তর পরিকল্পনায় কাজ হবে না; দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে এটিকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

প্রথমত জঙ্গল সলিমপুরের যেকোনো উন্নয়ন বা উদ্ধার পরিকল্পনার প্রথম শর্ত হতে হবে- ‘প্রকৃতির ওপর কোনো আঘাত নয়’। গত দুই দশকে যে পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে, তার ক্ষত নিরাময় এবং অবশিষ্ট পাহাড়ের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রথমে সমগ্র জঙ্গল সলিমপুরকে জরুরি ভিত্তিতে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। 

যেসব পাহাড় কেটে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, সেখানে অতি দ্রুত বৈজ্ঞানিক উপায়ে বনায়ন করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিন্নাঘাস, ছাতিম, শিমুল, জারুল ও কৃষ্ণচূড়ার মতো গভীরমূলী ও স্থানীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করা প্রয়োজন, যা পাহাড়ের মাটিকে শক্তভাবে কামড়ে ধরে রাখে এবং বর্ষাকালে মারাত্মক পাহাড়ধস রোধ করে। এই বনাঞ্চল একসময় বন্যহাতি, হরিণ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির নিরাপদ আবাসস্থল ছিল। বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণের জন্য বনের ভেতরের কাটা অংশগুলো জোড়া দিয়ে একটি অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক করিডোর তৈরি করতে হবে। পাহাড়ে কোনো ভারী ইট-পাথর-কংক্রিটের বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। যেকোনো অবকাঠামো হতে হবে শতভাগ পরিবেশবান্ধব এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢালকে অক্ষুণ্ণ রেখে। যদি কোনো ওয়াচ টাওয়ার, পর্যটনকেন্দ্র বা প্রশাসনিক বুথ তৈরি করতেই হয়, তবে তা কাঠ, বাঁশ, ছন এবং হালকা স্টিলের কাঠামোর সমন্বয়ে ‘গ্রিন আর্কিটেকচার’ বা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যরীতি মেনে করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পাহাড় সমতলকরণ করা যাবে না। পাহাড়ের ভেতরের সরু ও প্রাকৃতিক পথগুলোতে ভারী নির্মাণসামগ্রী বা উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
থাকবে, যাতে পাহাড়ের মাটি ধসে না পড়ে এবং বন্যপ্রাণীদের জীবনযাত্রা ব্যাহত না হয়।
আরও পড়ুন

দ্বিতীয়ত পাহাড়ের প্রাকৃতিক রূপ অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তার জন্য ডিজিটাল নজরদারি সবচেয়ে ভালো কার্যকর সমাধান। পাহাড়ের দুর্গম গিরিখাত ও ঘন বনের আড়ালে মানুষের গতিবিধি নজরদারি করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা প্রকৃতির কোনো ক্ষতি করবে না। এ ক্ষেত্রে ড্রোনে থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে গাছের পাতার আড়ালে বা রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব। তা ছাড়া সমগ্র অঞ্চলের চারপাশে একটি ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল সীমানা তৈরি করা যেতে পারে। ফলে কোনো তালিকাভুক্ত অপরাধী বা সন্দেহভাজন কেউ সেখানে প্রবেশ করতে গেলেই স্বয়ংক্রিয় লকডাউন ব্যবস্থা কার্যকর হবে। পাহাড়ের ভেতরে কোনো গোপন সুড়ঙ্গ বা বাঙ্কার আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে মেটাল ডিটেক্টর ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়মিত চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা আবশ্যক।

তৃতীয়ত জঙ্গল সলিমপুরে শুধু অপরাধীরাই থাকে না, সেখানে হাজার হাজার নিরীহ, দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষও রয়েছে, যারা সস্তায় আশ্রয়ের খোঁজে এসে অপরাধীদের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। সেখানে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের এনআইডি এবং বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই করে একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। কারা প্রকৃত ভূমিহীন আর কারা বহিরাগত অপরাধী, তা চিহ্নিত করতে হবে। প্রকৃত ভূমিহীন ও নদী ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোকে সরকারের ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’র অধীনে অন্য কোনো সমতল এলাকায় খাসজমিতে পুনর্বাসন করতে হবে। পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল থেকে মানুষকে সরিয়ে আনা জরুরি, কারণ বর্ষাকালে এখানে পাহাড়ধসে প্রাণহানির শঙ্কা থাকে।

তা ছাড়া জঙ্গল সলিমপুরের আশপাশের স্থায়ী বাসিন্দা এবং পুনর্বাসিত নিরীহ নাগরিকদের নিয়ে শক্তিশালী ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা কোনো বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে দেখলেই প্রশাসনকে তথ্য দেয়। তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে তথ্যদাতাকে পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি যারা দীর্ঘদিন মশিউর বা অন্যান্য সন্ত্রাসী বাহিনীর অধীনে কাজ করেছে (বিশেষ করে কিশোর ও যুবসমাজ), তাদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং এবং কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

তাদের যদি মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করা না যায়, তবে তারা জীবিকার তাগিদে আবার অন্য কোনো অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।

চতুর্থত জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ অপরাধী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা রয়েছে। সাধারণ আদালতে এই মামলাগুলোর বিচার দীর্ঘায়িত হলে অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই একটি বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে সব মামলার রায় কার্যকর করতে হবে, যাতে অন্য অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছায়। তা ছাড়া গত দুই দশকে পাহাড় কেটে এবং প্লট বাণিজ্য করে অপরাধী চক্র হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের নামে-বেনামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব এবং অবৈধ আয়ের উৎসগুলো চিহ্নিত করে বাজেয়াপ্তের পর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাখতে হবে। 

অপরাধের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিলে তাদের পক্ষে পুনরায় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা অসম্ভব হবে।

পঞ্চমত পূর্ববর্তী সময়ে দেখা গেছে, প্রশাসনের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা তথ্য পাচার করে উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ করে দিত। এটি রোধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে একটি স্বাধীন ‘কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স উইং’ গঠন করা যেতে পারে, যারা সলিমপুর অভিযানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের গতিবিধি ও আর্থিক লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি রাখবে।

ষষ্ঠত একটি এলাকাকে অপরাধমুক্ত রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো- সেখানে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সচল করা। তবে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শুরু করার আগেই জঙ্গল সলিমপুরকে কোর জোন, বাফার জোন ও উন্নয়ন জোন (সমতল বা পাহাড়ের পাদদেশ)- এই তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। কোর জোনে থাকবে পাহাড়ের সবচেয়ে গভীর ও ঘন জঙ্গল, যেখানে কোনো ধরনের পাকা স্থাপনা বা পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত অবাধ বিচরণ থাকবে না; এটি বন্যপ্রাণীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। বাফার জোনের অন্তর্ভুক্ত থাকবে কোর জোন এবং মূল লোকালয়ের মধ্যবর্তী অংশ। এখানে প্রকৃতির ক্ষতি না করে সীমিত আকারে মানুষের যাতায়াত এবং পরিবেশবান্ধব বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতে পারে। আর উন্নয়ন জোনে থাকবে পাহাড়ের পাদদেশ বা ইতিমধ্যে সমতল হয়ে যাওয়া অংশ, যেখানে উন্নয়ন কাজের জন্য মূল পাহাড় কাটতে হবে না।

জঙ্গল সলিমপুরের উন্নয়ন জোনের একটি অংশে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস কমপ্লেক্স বা অলিম্পিক ভিলেজ গড়ে তোলা যেতে পারে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বজায় রেখে যদি ক্রীড়া অবকাঠামো তৈরি হয়, তবে দেশের ক্রীড়া খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। তা ছাড়া কোর জোনের ভেতরে কক্সবাজারের ডুলাহাজরা বা গাজীপুরের মতো সাফারি পার্ক করা সম্ভব। তবে এটি সাধারণ পার্কের মতো উন্মুক্ত থাকবে না, প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত থাকতে হবে। এখানে প্রাণীগুলো স্বাভাবিক পরিবেশে উন্মুক্ত থাকবে এবং মানুষ দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে তা পর্যবেক্ষণ করবে। এ ছাড়া রাতে বন্যপ্রাণী দেখার জন্য ‘নাইট সাফারি’র ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের দৈনিক সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে এবং তীব্র আলো ও শব্দের যানবাহনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। সর্বোপরি পর্যটকদের সার্বক্ষণিক যাতায়াত থাকলে অপরাধীরা তাদের গোপন আস্তানা টিকিয়ে রাখতে পারবে না।

এ ছাড়া জঙ্গল সলিমপুরের উন্নয়ন জোনে একটি হাইটেক পার্ক করা যেতে পারে, যা শিক্ষিত তরুণদের আকর্ষণ করবে। 

পাশাপাশি বাফার জোনে পরিবেশবান্ধব উপায়ে ট্র্যাকিং, জিপ-লাইনিং, মাউন্টেন বাইকিং ও ক্যাম্পিংয়ের মতো আধুনিক অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। তা ছাড়া এখানকার গিরিখাতগুলোতে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করা যেতে পারে। এটি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বৃষ্টির পানি ধরে রাখবে এবং বিনোদনের চমৎকার মাধ্যম হবে। হ্রদের চারপাশে ওয়াকওয়ে বানালে এলাকাটি সুরক্ষিত পাবলিক স্পেসে পরিণত হবে। তবে কৃত্রিম হ্রদ বানানোর ক্ষেত্রে বিস্তর চিন্তাভাবনার বিষয় আছে। এর জন্য আগে হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে করতে হবে এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। হাঁটার রাস্তায় কংক্রিট ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব উপাদান দিতে হবে, যেন বৃষ্টির পানি মাটির নিচে চুইয়ে যেতে পারে।

কেবল র‌্যাব বা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন ও মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীমুক্ত করা যাবে না; এর জন্য এরকম সুদূরপ্রসারী চতুর্মুখী কৌশলের সফল ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন জরুরি।

লেখক ও গবেষক

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: