রফতানি পণ্যের মধ্যে চামড়া হচ্ছে আমাদের অন্যতম পণ্য। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রফতানি করে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। চামড়া বছরে সবসময় সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। মূলত ঈদুল আজহায় দেশে ৬০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ করা হয়।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার ন্যূনতম মূল্য দিচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। অথচ মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনে সেই চামড়া ট্যানারি মালিকরা রফতানি করছে সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকায়। কুরবানির ঈদ এলেই ট্যানারি মালিকরা কীভাবে কম দামে চামড়া কেনা যায়, সেই চেষ্টাই করে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কুরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এ দাম গত বছরের নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি।
গত বছরও কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। চামড়ার দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় দেশের অন্যতম এ রফতানি পণ্যটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দেয় হতাশা।
ঈদুল আজহা এলেই দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, কিন্তু এর পাশাপাশি ঝুলে থাকে এক গভীর উদ্বেগ- কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ। এই চামড়ার মূল্যমান ও ব্যবস্থাপনায় বারবার অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয় খামারি, ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের।
এবারের ঈদেও সেই সমস্যাগুলোর ব্যত্যয় ঘটেনি। কুরবানির চামড়া নিয়ে এবারও ঘটেছে নানা তুঘলকি কাণ্ড। যার ফলে চামড়া সংগ্রহসহ দাম ও সংরক্ষণে নানা অব্যবস্থাপনা বিদ্যমান ছিল। যা চামড়া শিল্পের শুধু ক্ষতিই হয়নি, জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধাক্কাও দিতে পারে। সেই লক্ষ্যে এখন সময়ের দাবি- সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সরকারি হিসাবে এবার কুরবানির পশুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকার মধ্যে নির্ধারিত হলেও মাঠে তা মানা হয়নি। অধিকাংশ সময়ই চামড়া বিক্রি হয়েছে অত্যন্ত কম দামে। ২ হাজার টাকার চামড়া ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ঢাকার বাইরে ৩০০ টাকার চামড়া ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
শুধু তাই নয়, শত শত চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীরা দখল করে নেয় বাজারের নিয়ন্ত্রণ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খামারি, শ্রমিক এবং দরিদ্র পরিবারগুলো, যারা এই চামড়ার ওপর নির্ভরশীল। গরমের মৌসুমে চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে আরও প্রকট হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চামড়া এখনও বিক্রি হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো- আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও অর্থসংকট। ফলে নতুন চামড়া সংগ্রহ ও রফতানি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোও চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণে অনীহা দেখাচ্ছে বলে প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৮৯২ কোটি টাকা, যা শিল্পের জন্য বড় অঙ্ক। ব্যাংকগুলো বলছে, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি থাকায় নতুন ঋণ দিতে তারা আগ্রহী নয়। এই পরিস্থিতিতে চামড়ার বাজারে পর্যাপ্ত অর্থ ও সমর্থনের অভাব দেখা দিয়েছে, যা এ খাতের উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রমিকদের অবস্থাও খুব সুবিধাজনক নয়। ন্যূনতম মজুরি এখনও নিশ্চিত হয়নি, অনেক কারখানায় ঈদের আগে বেতন ও বোনাস দেওয়া হয়নি। শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে, তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ চরমে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও জীবনমান রক্ষার জন্য অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সরকার ইতিমধ্যে কুরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করেছিল। কিন্তু এ কন্ট্রোল রুম কি মনিটরিং করেনি? এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠতেই পারে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
কুরবানির চামড়ার এই সংকট শুধু একটি ব্যবসায়িক বিষয় নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতি, শ্রমিকের জীবিকা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত বিষয়। সবার অংশগ্রহণে একটি সুসংগঠিত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, যাতে এই সম্পদ থেকে দেশের প্রকৃত সম্ভাবনা পূরণ হয় এবং দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এ অবস্থার অবসানে সংশ্লিষ্টরা সঠিক তদারকির পাশাপাশি যথাযথ পদক্ষেপ নেবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
/এসএকে