বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সেকাল একাল

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড শুধু ইট-পাথরের দালান কিংবা যন্ত্রের গর্জনে গড়ে ওঠে না, তার পেছনে থাকে কোটি মানুষের ঘাম, ঐতিহ্য

2026-06-03T14:42:44+00:00
2026-06-03T14:42:44+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সেকাল একাল
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ২:৪২ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড শুধু ইট-পাথরের দালান কিংবা যন্ত্রের গর্জনে গড়ে ওঠে না, তার পেছনে থাকে কোটি মানুষের ঘাম, ঐতিহ্য আর মাটির সুবাস। বাংলাদেশের চামড়া শিল্প তেমনই এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যা একসময় এ দেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, রফতানি আয়ের খাতকে করেছে সমৃদ্ধ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনেছে এক অভাবনীয় গতিশীলতা। 

সেকালের সেই সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি আজ যেমন আমাদের গর্বিত করে, তেমনি একালের করুণ দশা আমাদের হৃদয়কে ব্যথিত এবং বিবেককে দংশিত করে। ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতায় চামড়া শিল্পের এই বিবর্তন কেবল একটি শিল্পের উত্থান-পতনের গল্প নয়, এটি একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির আখ্যান।

বাংলার উর্বর মাটিতে মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত এই অঞ্চলের পশুর চামড়ার গুণগত মান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। দেশভাগের পর, চল্লিশের দশকের শেষের দিকে রণদা প্রসাদ সাহাসহ কয়েকজন দূরদর্শী উদ্যোক্তার হাত ধরে নারায়ণগঞ্জে প্রথম বাণিজ্যিক ট্যানারি স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে সরকারি উদ্যোগে ট্যানারি শিল্পকে ঢাকার হাজারীবাগে স্থানান্তরিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চামড়া শিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
আরও পড়ুন

ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এই শিল্প এক বিশাল রূপান্তর প্রত্যক্ষ করে, যখন হাজারীবাগ এলাকায় একের পর এক নতুন ট্যানারি গড়ে উঠতে থাকে। পাকিস্তানের মোট চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের সিংহভাগই উৎপাদিত হতো এই বাংলায়, যা পশ্চিম পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হতো। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ অঞ্চলে প্রায় ৩০টিরও বেশি ট্যানারি পুরোদমে সচল ছিল এবং বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ১ কোটি বর্গফুট চামড়া ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে পরিত্যক্ত ট্যানারিগুলোকে জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ ট্যানার্স করপোরেশন গঠন করা হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীনে ন্যস্ত হয়। সত্তরের দশকের শেষের দিকে বিশেষ করে ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে সরকার ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতকে উৎসাহিত করতে ট্যানারিগুলো বিজাতীয়করণ বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। ১৯৭৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা চামড়ার পরিবর্তে ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া রফতানির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

নব্বইর দশকে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প তার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় ও স্বর্ণযুগে পদার্পণ করে, যখন বিশ্ববাজারে ‘ঢাকা গ্লেস কিড’ এবং উন্নত মানের গরুর চামড়ার চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, যা তৎকালীন মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এই সময়ে বার্ষিক চামড়া উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি বর্গফুটে, যার সিংহভাগই ইউরোপ, জাপান ও আমেরিকার বাজারে রফতানি হতো।

চামড়া শিল্পের এই স্বর্ণযুগে দেশের অভ্যন্তরে পশুর চামড়ার দাম ছিল সাধারণ মানুষের কল্পনার চেয়েও আকর্ষণীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ। নব্বইয়ের দশক এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে একটি ভালো মানের গরুর চামড়া ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত অনায়াসে বিক্রি করা সম্ভব হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন একটি মাঝারি আকারের জ্যান্ত গরুর বাজারমূল্য যেখানে ছিল ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা, সেখানে শুধু তার চামড়াটিই বিক্রি হতো মোট মূল্যের এক-চতুর্থাংশ দামে।

সেকালের এই উচ্চমূল্যের চামড়া বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় অর্থনীতিতে এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী বিপ্লব ঘটিয়েছিল, যা অভাবি মানুষের মুখে অন্ন জুগিয়েছে। কুরবানির ঈদের চামড়া বিক্রির অর্থ সরাসরি চলে যেত এতিমখানা, মাদরাসা, মসজিদ এবং সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র, অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের কল্যাণে। একটিমাত্র গরুর চামড়া বিক্রি করে প্রাপ্ত ৪ হাজার টাকা দিয়ে তখন একটি মাদরাসার এতিম শিশুর কয়েক মাসের ভরণপোষণ কিংবা একাধিক দরিদ্র পরিবারের এক মাসের চাল-ডালের ব্যবস্থা হয়ে যেত। চামড়া ছিল ধনীর কুরবানি আর গরিবের হকের মধ্যকার এক ঐশ্বরিক সেতু, যা গ্রামীণ জনপদে এনে দিত উৎসবের বাড়তি আনন্দ।

স্বর্ণযুগের এই অর্থনৈতিক জোয়ার কেবল কাঁচা চামড়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা চামড়াজাত পণ্য তৈরিতেও এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার করেছিল। ২০০০-২০০১ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চামড়া খাত থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে। লক্ষাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং শত শত কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ লেনদেন এই শিল্পকে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছিল।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেও এই শিল্পের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল এবং ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২২ কোটি বর্গফুটে গিয়ে পৌঁছায়। পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরের আলোচনা এই সময়েই গতি পায়, যা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য জরুরি ছিল। সেকালের সেই শেষ দিনগুলোতেও চামড়া ছিল একটি মহামূল্যবান জাতীয় সম্পদ, যাকে ঘিরে দেশের ব্যাংক খাত, রফতানি খাত এবং সাধারণ মানুষের মনে ছিল এক বিশাল প্রত্যাশা ও আত্মবিশ্বাস।

তবে সোনালি অতীতের সেই দীপ্তি একালের নির্মম বাস্তবতার মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে এবং গত এক দশকে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এক চরম দৈন্যদশা ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারিগুলো তাড়াহুড়ো করে স্থানান্তর করা হলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না হওয়ায় পরিবেশগত ছাড়পত্র অর্জনে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদ না থাকায় পশ্চিমা বিশ্বের নামি ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বাংলাদেশ সরাসরি ফিনিশড চামড়া রফতানির সুযোগ হারাতে শুরু করে, যা এই ধসের মূল কারণ।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে চামড়া খাত থেকে রফতানি আয় ছিল প্রায় ১.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা পরের বছরগুলোতে ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ৭৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে আসে, যা এই শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

এই প্রাতিষ্ঠানিক ধসের সবচেয়ে বড় শিকার হন দেশের তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র মৌসুমি ব্যবসায়ী, ফড়িয়া এবং সাধারণ পাইকাররা, যারা প্রতি বছর কুরবানির ঈদে পুঁজি বিনিয়োগ করতেন। গত কয়েক বছরে কাঁচা চামড়ার বাজার দর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, হাজার টাকার চামড়া একশ-দেড়শ টাকায় বিক্রি হতে শুরু করে।

বাজারের এই চরম মন্দাভাব গ্রামীণ সমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এক মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ধাক্কা নিয়ে আসে। যে চামড়া বিক্রি করে মাদরাসার এতিম শিশুদের তিন বেলার খাবার জুটত, গত কয়েক বছরে সেই চামড়ার দাম নামমাত্র মূল্যে নেমে আসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। বহু গ্রামীণ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং তাদের ফ্রি লজিং ও খাবার সুবিধা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার এতিম শিশুর শিক্ষা হুমকির মুখে পড়েছে।

চামড়ার সঠিক মূল্যায়ন ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কুরবানির ঈদে সংগৃহীত চামড়ার একটি বিশাল অংশ লবণের চড়া দাম এবং আড়তদারদের অনীহার কারণে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এক সময়ের সোনালি সম্পদ ‘চামড়া’ দেশের মানুষের কাছে এক বোঝা ও বিড়ম্বনার বিষয়ে পরিণত হয়।
বিপর্যয়ের এই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ঈদুল আজহা বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের ইতিহাসে চূড়ান্ত অবমূল্যায়নের এক বিভীষিকাময় রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। এ বছর কুরবানির পশুর চামড়ার দাম এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, একটি বড় সাইজের গরুর চামড়া মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা একটি পানির বোতলের দামের চেয়েও কম। মূল্যহীনতার এই চরম সীমানায় পৌঁছে ক্ষোভে, দুঃখে ও হতাশায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ চামড়া বিক্রি না করতে পেরে নদীতে, খালে কিংবা ডাস্টবিনে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এই দৃশ্য কেবল একটি পণ্যের অপচয় নয়, এটি একটি দেশের জাতীয় সম্পদের ওপর এক চরম আঘাত এবং অবমাননার শামিল।

এই অভূতপূর্ব মূল্যহীনতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের প্রান্তিক ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চড়া ভাড়ায় ট্রাক বা ভ্যানযোগে চামড়া আড়তে এনে তারা দেখেন, চামড়া কেনার মতো কোনো ক্রেতাই নেই, আর থাকলেও তা নামমাত্র মূল্যে। লবণ কেনা ও শ্রমিকের মজুরির টাকা তো দূরের কথা, যাতায়াত ভাড়ার টাকাও চামড়া বিক্রি করে না ওঠায় অনেকে আড়তেই চামড়া ফেলে রেখে কেঁদে বাড়ি ফিরেছেন।

ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিপর্যয় দেশের লাখ লাখ অসহায় এতিম, মিসকিন ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর এক চরম আঘাত হেনেছে। অনেক মাদরাসার শিক্ষকরা তাদের বেতন পাচ্ছেন না এবং এতিম শিশুদের মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, চামড়া ছাড়ানো এবং তা সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ কসাই, দিনমজুর ও লবণ শ্রমিকরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির পর কোনো পারিশ্রমিকই পাননি, যা এক চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত। ২০২৬ সালের এই বিপর্যয় প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি, তদারকি এবং দেশীয় সম্পদের প্রতি মায়ার অভাবে কীভাবে একটি বিলিয়ন ডলারের শিল্প খাতকে জীবন্ত কবর দেওয়া সম্ভব।

প্রাবন্ধিক 

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: