ঋণ শব্দটি অনেক সময় নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়। ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ঋণ নিতে হয়। কিন্তু সময়মতো যদি ঋণ ফেরত দেওয়া না হয় তখন সেটা এক বদভ্যাসে পরিণত হয়। তখনই ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেকোনো সংস্থা ঋণখেলাপি হয়ে যায়। কিন্তু এই ঋণখেলাপি যদি দীর্ঘমেয়াদি হয় তখন দেশের ব্যাংকিং খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ে।
গত ১৭ বছরে ব্যাংকগুলো থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বের করে নেওয়া ঋণের বেশিরভাগই বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ খেলাপি ঋণের বড় অংশই দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বড় ঋণখেলাপিদের অনেকে পাচার করা অর্থে ইউরোপ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী আবাস গড়েছেন। এছাড়া গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকা। যা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গভীর দুর্বিপাকের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান প্রমাণ করছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে নানা বিশ্লেষক পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব, তদারকির দুর্বলতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরেছেন। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায়, যা তিন মাসের মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
অনেক ঋণ গ্রহণকারী সময়ের পরিবর্তে ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন, যা প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করে দেয়। ফলে ব্যাংকগুলোর আসলে আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, আর ক্ষতির মুখে পড়ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে ৯৩ শতাংশই ‘ব্যাড’ বা ‘লস লোন’, যা আদায় করা অত্যন্ত কঠিন। এর পাশাপাশি প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা হলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি আসত, কিন্তু বাস্তবে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে শ্রেণিকৃত ঋণের হার প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি। এর মানে হলো- অর্ধেকের বেশি ঋণই এখন ঝুঁকির মধ্যে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং পরিচালনাগত দুর্বলতার ফল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংকটের মূল কারণ হলো খেলাপি ঋণের অপব্যবহার ও অব্যবস্থাপনা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতির জন্য পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহার অন্যতম বড় কারণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, ঋণ শ্রেণিকরণে স্বচ্ছতা ও কঠোরতা জরুরি। এখন প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, বড় খেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিকে আরও স্বচ্ছ ও কঠোর করে তোলা। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু ব্যাংকিং খাতের জন্য নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট বাড়ছে, বিদেশি ঋণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি এই সংকটের সমাধান না হয়। তাই এখন সময়ের দাবি, কঠোর ও সুসংগঠিত পদক্ষেপ গ্রহণের।
নীতিনির্ধারকদের উচিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা। না হলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি হবে ভয়াবহ। যা আমাদের কাম্য নয়। দ্রুত খেলাপি ঋণের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক প্রবাহ সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে- এটাই প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/আআ