মায়ের মৃত্যু ও সমাজের আত্মসমালোচনা

ওয়াসিম ফারুক

মতামত

১৬৮টি দীর্ঘ ঘণ্টা, সাত-সাতটি দিন ও রাত। সময়ের হিসাবে এটি হয়তো মাত্র এক সপ্তাহ, কখনো এই এক সপ্তাহই রচনা হয়

2026-06-04T05:29:37+00:00
2026-06-04T05:29:37+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
মতামত
মায়ের মৃত্যু ও সমাজের আত্মসমালোচনা
ওয়াসিম ফারুক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৫:২৯ এএম   (ভিজিট : ৩)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
১৬৮টি দীর্ঘ ঘণ্টা, সাত-সাতটি দিন ও রাত। সময়ের হিসাবে এটি হয়তো মাত্র এক সপ্তাহ, কখনো এই এক সপ্তাহই রচনা হয় এক উপাখ্যান যা কখনো অন্ধকার উপাখ্যান, আর্তনাদের উপাখ্যান, আমাদের সভ্যতার লজ্জার উপাখ্যান। আমি আজ বলব নুরজাহান বেগম নামের ৭৫ বছর বয়সি এক মায়ের উপাখ্যান। সেই উপাখ্যানের শেষ অধ্যায়ে জীবনের কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল শুধু নিঃসঙ্গতা, অসুস্থতা, অবহেলা, নীরবতা এবং মৃত্যু।

নুরজাহান বেগম ঢাকার মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে নিথর হয়ে পড়ে ছিলেন। মৃত্যুর পরও দিনের পর দিন কেউ তার খোঁজ নেয়নি। ধীরে ধীরে তার দেহ পচে যেতে শুরু করে, ঘরসহ আশপাশের পরিবেশ ভরে ওঠে দুর্গন্ধে, আর চারপাশ সাক্ষী হয়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতার। নুরজাহান বেগমের মরদেহ দেখে প্রতিবেশীদের অনেকেরই ধারণা তার মৃত্যু হয়েছে অন্তত সাত দিন অর্থাৎ ১৬৮ ঘণ্টা আগে।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয় এটি আমাদের সমাজের মানবিক অবক্ষয়, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং মূল্যবোধের সংকটের এক মর্মান্তিক প্রতিচ্ছবি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ‘মা’ শব্দটি সবচেয়ে পবিত্র ও শ্রদ্ধার প্রতীকগুলোর একটি। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম, সংস্কৃতি ও দর্শন মাতৃত্বকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসিয়েছে। ইসলাম মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত খুঁজে পেয়েছে। 

যুগে যুগে মা তার সন্তানের জন্য নিজের স্বপ্ন, আরাম, ঘুম এবং ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। অথচ সেই মায়ের জীবনের শেষ অধ্যায়ে যদি এমন নিঃসঙ্গ ও করুণ পরিণতি অপেক্ষা করে, তা হলে আমাদের নিজেদের প্রতিই প্রশ্ন ছুড়ে দিতে হয় আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হয়েছি, নাকি শুধু ডিগ্রিধারী হয়েছি? 

এই ঘটনার আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হলো, নুরজাহান বেগমের সন্তানরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত মানুষ। মৃতের তিন ছেলে সমাজে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। তাদের একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং অন্যজন কানাডা প্রবাসী। এছাড়া তার মেয়ের স্বামীও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? কেবল পেশাগত সাফল্য অর্জন নাকি একজন মানুষের ভেতরে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা গড়ে তোলা?

আধুনিক নগরসভ্যতার অন্যতম বড় সংকট হলো পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যুক্ত করেছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে পারেনি। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষের খবর রাখি, অথচ অনেক সময় নিজেদের মা-বাবার নিঃসঙ্গতার খবর রাখি না। কর্মব্যস্ততা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা এবং আত্মকেন্দ্রিক সাফল্যের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বার্ধক্যে দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব শারীরিক অসুস্থতার মতোই ক্ষতিকর। এটি হৃদরোগ, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের সমাজে বৃদ্ধ মানুষের মানসিক চাহিদা ও আবেগগত নিরাপত্তাকে এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাদের খাবার দেওয়া হয়, ওষুধ দেওয়া হয়, কিন্তু সময় দেওয়া হয় না; দায়িত্ব পালন করা হয়, কিন্তু সঙ্গ দেওয়া হয় না; ভরণপোষণ দেওয়া হয়, কিন্তু ভালোবাসা দেওয়া হয় না। 

একজন মা যখন সন্তানকে জন্ম দেন, তখন তিনি শুধু একটি শিশুর জন্ম দেন না তিনি নিজের জীবনের একটি বড় অংশ সন্তানের জন্য উৎসর্গ করেন। সন্তানের অসুস্থতায় তিনি রাত জাগেন, ব্যর্থতায় কাঁদেন, সফলতায় গর্বে ভরে ওঠেন। সেই সন্তান যদি একদিন মায়ের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব না করে, তা হলে সেটি শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয় সেটি নৈতিকতারও পরাজয়।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে ভালো চাকরি, বড় পদ, উচ্চ বেতন কিংবা নামি প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি একজন মানুষকে মহান করে না। প্রকৃত মহানতা নির্ধারিত হয় তার মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং পরিবারের প্রতি আচরণের মাধ্যমে।

একটি জাতির নৈতিক মানদণ্ড বোঝা যায় তারা তাদের শিশু ও বৃদ্ধদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দেখে। যদি কোনো সমাজে বৃদ্ধ মা-বাবা একাকিত্বে জীবন কাটান, অবহেলায় মারা যান কিংবা নিজেদের সন্তানদের কাছেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেন, তা হলে সেই সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যতই হোক, মানবিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আজ নুরজাহান বেগম আর নেই। কিন্তু তার নীরব মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে রইল। হয়তো আমাদের আশপাশেও এমন অনেক মা-বাবা আছেন, যারা প্রতিদিন অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের, একটু খোঁজ নেওয়ার, একটু স্পর্শের কিংবা একটি বাক্যের ‘মা, তুমি কেমন আছো?’

তাই আজ যাদের মা-বাবা বেঁচে আছেন, তাদের কাছে অনুরোধ, একটু সময় দিন। তাদের পাশে বসুন, তাদের কথা শুনুন, তাদের অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনুশোচনাগুলোর একটি হলো যখন মানুষ উপলব্ধি করে, তখন অনেক সময় মা-বাবা আর বেঁচে থাকেন না। প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম আছে আজ আমরা সন্তান, কাল আমরা মা-বাবা হব। 

আজ আমরা যে আচরণের বীজ বপন করছি, আগামী প্রজন্ম সে ফলই আমাদের হাতে তুলে দেবে। তাই নুরজাহান বেগমের এই মর্মান্তিক মৃত্যুকে শুধু একটি সংবাদ হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। যেন আর কোনো মা জীবনের শেষ প্রহরে ভালোবাসাহীন নিঃসঙ্গতার শিকার না হন, যেন আর কোনো সন্তানের অবহেলায় কোনো মায়ের শেষ আশ্রয় হয়ে না ওঠে একটি নীরব, বন্ধ ঘর।

প্রাবন্ধিক

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   মা  মৃত্যু  সমাজ  আত্মসমালোচনা 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: