মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসন ও ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ ক্রমশ আরও বিস্তৃত রূপ নিচ্ছে। ইরানের উচ্চগতির ও দিক পরিবর্তনকারী ক্ষেপণাস্ত্র (যাকে অনেক বিশ্লেষক ড্যান্সিং মিসাইল বলছেন) ইসরাইলের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
এদিকে কাতার ও বাহরাইনে একাধিকবার সাইরেন বাজানো হয়েছে। জেরুজালেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সময়ে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরেও হামলার আশঙ্কা ও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরাইল দাবি করেছে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরানসহ অন্তত তিনটি শহরে একযোগে বড় পরিসরে হামলা চালাচ্ছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো দেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তা চাইলেও ইউরোপের অনেক দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনীহা দেখাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পথ খুঁজতে সক্রিয় হয়েছে এবং ইরান ও লেবাননের জন্য নতুন মানবিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের এই পর্যায়ে ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে আয়রন ডোম ও সংশ্লিষ্ট বহুস্তর প্রতিরক্ষা প্রতিনিয়ত চাপের মুখে পড়ছে। ইরানের নতুন ধরনের উচ্চগতির ও কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে বলে বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন। ফলে যুদ্ধ এখন শুধু আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতার পরীক্ষাতেও পরিণত হয়েছে।
উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র ও ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ নিয়ে নতুন আতঙ্ক : ইরান-ইসরাইল সংঘাতে সবচেয়ে আলোচিত সামরিক প্রযুক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ইরানের নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র। বিশেষ করে ‘সেজিল’ নামের ক্ষেপণাস্ত্রকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর জানিয়েছে, তারা ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, এটি একটি কঠিন জ্বালানিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র যার পাল্লা প্রায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের গতি শব্দের গতির প্রায় তেরো গুণ পর্যন্ত হতে পারে। এমন গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন।
বহু সামরিক বিশ্লেষক বলছেন, এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে দিক পরিবর্তন করতে পারে এবং একাধিক প্রতিরক্ষা স্তরকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম। এ জন্যই একে অনেকে ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ বলে উল্লেখ করছেন।
বিবিসির গতকালের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলের আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং ও অ্যারো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর এখন বড় চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবগুলো প্রতিহত করতে পারে না। এই পরিস্থিতি ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও বড় মাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সামনে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
যুদ্ধের বিস্তার শুধু ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে হামলার ঝুঁকি বাড়ছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলের আকাশে প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যে ৩৭টি ড্রোন ধেয়ে আসে। সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সবগুলো ড্রোনই প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ড্রোন কোথা থেকে ছোড়া হয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি। তবে ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রিয়াদ বলছে, তারা তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করেছে। কারণ এই অঞ্চলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সৌদির বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন যুদ্ধ এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বড় ভূমিকা পালন করছে। স্বল্প খরচে তৈরি এসব ড্রোন দূরপাল্লার হামলা চালাতে পারে এবং অনেক সময় প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে সহায়তা করা যেকোনো কেন্দ্র তাদের হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।
তাসনিম বার্তা সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দফতরের এক মুখপাত্র এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, লোহিত সাগরে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি ইরানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক সংঘাতের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখছেন। কারণ এতে শুধু সামরিক লক্ষ্য নয়, সহায়ক অবকাঠামোও সম্ভাব্য হামলার তালিকায় চলে আসে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানে তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা এখনও হাজারের বেশি। বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, তারা প্রতিদিন নতুন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করছে। দ্য গার্ডিয়ানকে উদ্ধৃত করে আলজাজিরা জানিয়েছে, ইসরাইল অন্তত তিন সপ্তাহের সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই সময়সীমা ইহুদি উৎসব পাসওভার পর্যন্ত বিস্তৃত। ডেফরিন বলেন, এই সময়ের পরের পর্যায়ের জন্যও তাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসরাইলি বাহিনী দাবি করেছে, তারা তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে একটি নির্ভুল হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ব্যবহৃত একটি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর টেলিগ্রাম বার্তায় বলা হয়েছে, এই হামলার ফলে ইরানের সামরিক সমন্বয় ও যোগাযোগ সক্ষমতা দুর্বল হবে। তবে ইরান এই দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ইসরাইল ঘোষণা করেছে, তারা ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে একযোগে হামলা চালাচ্ছে। এই শহরগুলো হলো তেহরান, শিরাজ ও তাবরিজ।
আলজাজিরা জানিয়েছে, এসব হামলা অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে। তাবরিজ ইরানের চতুর্থ বৃহত্তম শহর এবং তুরস্ক-আর্মেনিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত। শিরাজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় শহর।
ইরানের আধা-সরকারি ফারস সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, তেহরানের পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি ভবনে বিমান হামলা হয়েছে। এই হামলায় কয়েকজন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি।
কাতারে এক ঘণ্টার মধ্যে দুইবার সাইরেন বাজানো হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। একই সময়ে বাহরাইনেও সতর্কতা জারি করা হয় এবং নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়। জেরুজালেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড।
ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ৩ হাজার ৩৬৯ জন আহত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় আহত হয়েছেন ১৪২ জন। এর আগে জানানো হয়েছিল, অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে ইউরোপীয় দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যুদ্ধে জড়াবে না। জার্মানি ও গ্রিসও একই অবস্থান জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
সময়ের আলো/আরবিএন