মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর কাছে প্রণালিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা চেয়েছেন এবং ন্যাটো দেশগুলোকে এগিয়ে আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন। হুমকিও দিচ্ছেন তিনি।
তবে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না। একই সময়ে ব্রিটেন বলছে, মিত্রদের সঙ্গে যৌথ পরিকল্পনা করে প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, আর ইরান ঘোষণা দিয়েছে এই পথ ‘শত্রুদের জন্য বন্ধ’।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। সংঘাতের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং বহু তেলবাহী জাহাজ উপসাগরের বাইরে অপেক্ষা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রণালিটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক দেশ বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিত্র দেশগুলোর সহায়তা চেয়েছেন। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খোলা রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।
তিনি বলেন, আমি চাই এসব দেশ এগিয়ে এসে নিজেদের এলাকা রক্ষা করুক। কারণ এখান থেকেই তারা জ্বালানি পায়।
ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সাতটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা ন্যাটো সদস্য দেশ। তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময় ন্যাটোর জন্য আছি। ইউক্রেন ইস্যুতেও আমরা তাদের সাহায্য করছি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে সতর্ক করে তিনি বলেন, প্রণালিটি অচল করে দিতে খুব বেশি কিছুর দরকার হয় না। ট্রাম্পের ভাষায়, মাত্র দুয়েক জন মানুষও এখানে মাইন পেতে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করা উচিত।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যদি মিত্রদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া যায়, তা হলে তা ন্যাটোর ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না।
তিনি আরও জানান, মিত্রদের কাছ থেকে মাইন অপসারণকারী জাহাজ এবং এমন সেনাদল চান যারা ইরান উপকূলে থাকা ‘হুমকি’ মোকাবিলা করতে পারবে। ট্রাম্পের মতে, যারা হরমুজ প্রণালি থেকে জ্বালানি সুবিধা নেয়, তাদেরই উচিত এই পথ নিরাপদ রাখা।
তবে ট্রাম্পের আহ্বানে সব দেশ সাড়া দিচ্ছে না। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দেশটির পার্লামেন্টে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজকে এসকর্ট দেওয়ার জন্য নৌবাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা টোকিওর নেই। তিনি বলেন, আমরা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। জাপান স্বাধীনভাবে কী করতে পারে এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে কী সম্ভব, তা আমরা পর্যালোচনা করছি।
একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়াও। সে দেশের পরিবহন মন্ত্রী ক্যাথরিন কিং এবিসি রেডিওকে বলেন, দেশটি হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজ পাঠাবে না। তিনি বলেন, আমরা যে অনুরোধ পেয়েছি, সে অনুযায়ী আমাদের অবদান কী হবে তা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছি। কিন্তু আমরা হুরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাঠাচ্ছি না।
তবে তিনি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমান সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, হরমুজ প্রণালিকে আবার সচল করতে মিত্রদের সঙ্গে যৌথ পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হলে হুরমুজ প্রণালি খুলতেই হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি সহজ কাজ হবে না।
স্টারমারের মতে, ইউরোপীয় অংশীদার ও অন্য মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা চলছে যাতে দ্রুত একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা যায় এবং অঞ্চলে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা যায়।
অন্যদিকে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি তাদের শত্রুদের জন্য বন্ধ থাকবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে বলেন, যারা ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে বা সেই হামলার মিত্র; তাদের জন্য এই পথ ব্যবহার করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ১৫ দিন যুদ্ধ চালানোর পর তারা এখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যদের দ্বারস্থ হচ্ছে।
আরাগচির দাবি, যারা গতকাল পর্যন্ত অন্য দেশকে শত্রু বলত, আজ তারা সেই দেশগুলোর কাছেই সাহায্য চাইছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। ফলে সেখানে কোনো ধরনের অবরোধ বা সংঘাত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত ব্যাহত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতি নতুন জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।