ঈদ এলেও রোহিঙ্গারা ফেরেনি নিজ দেশে

মো. শাহিন আলম

বিবিধ

প্রায় দেড় বছরের শাসনামল শেষে বিদায় নিয়েছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা

2026-03-18T06:10:48+00:00
2026-03-18T06:10:48+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
বিবিধ
ঈদ এলেও রোহিঙ্গারা ফেরেনি নিজ দেশে
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬, ৬:১০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রায় দেড় বছরের শাসনামল শেষে বিদায় নিয়েছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়তো সেই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। 

কিন্তু রাষ্ট্রের সামনে যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও মানবিক সংকটগুলো ছিল, বিশেষত রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে কতটুকু এগিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে হিসেব কষার সময় বোধহয় বর্তমান সরকারের জন্য এখনই এসে গেছে।

দীর্ঘদিন থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জটিল মানবিক সংকট হয়ে ওঠা রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে। প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ এই সংকটের প্রধান ভার বহন করছে। 

সময় যত গড়াচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান ততই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। স্বভাবতই জনমনে এই সংকটের সুরাহা নিয়ে পাহাড়সম প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। 

গত বছরের মার্চে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস বাংলাদেশ সফর করেন। সফরের সময় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। সে সময় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দীপ্ত কণ্ঠেই বলা হয়েছিল পরবর্তী বছরের ঈদের আগেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটবে। 

স্থানীয় ও রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর জনমনেও একধরনের আশার সঞ্চার ঘটেছিল। কিন্তু সময়ের বাস্তবতা যেন সেই আশাবাদকে নির্মমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ঈদ আবারও চলে এসেছে, অথচ রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া তো দূরের কথা, বরং তাদের সংখ্যা বাংলাদেশে আরও বেড়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ১১ লাখ ৮৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নতুন করে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছে। 

বরং তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার উপস্থিতি বাংলাদেশের একটি মাঝারি আকারের জেলার জনসংখ্যার সমান, যা স্বভাবতই বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বহন করা অত্যন্ত কঠিন। রোহিঙ্গা সংকটের ইতিহাস অবশ্য দেশে নতুন নয়। 

১৯৭৮ সালে অপারেশন ড্রাগন কিং নামক জান্তা সরকারের সামরিক অভিযানের ফলে প্রথম বড় ঢলে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। যদিও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাহসী পদক্ষেপের ফলে বার্মা সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছান এবং এর ফলে ১,৮০,০০০ রোহিঙ্গা বার্মায় প্রত্যাবাসন করে। 

পরবর্তীতে ১৯৯১-৯২ সালে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। তবে সবচেয়ে বড় ঢল আসে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর, যখন প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক মহল সেই সময় ঘটনাটিকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তবু এত বছর পেরিয়ে গেলেও নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের পথ আজও অনিশ্চিত।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দেশটির সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই দেশটি কার্যত গৃহসংঘাতে নিমজ্জিত। রাখাইন রাজ্য, যেখানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা, সেটিই এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। এই বাস্তবতায় সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরের কথা, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাও অনুপস্থিত। ফলে প্রত্যাবাসন নিয়ে যেকোনো উদ্যোগ বাস্তবতার দেয়ালে গিয়ে থেমে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবলই মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং কূটনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে এই সংকটের ব্যয় বিপুল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ২০২৫-২৬ সময়কালে প্রায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রয়োজন। 

কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই সব মৌলিক চাহিদা পূরণে জাতীয় বাজেট থেকে বাংলাদেশ সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব যে ফেলবে, তা সহজেই অনুমেয় হচ্ছে।

পরিবেশগত ক্ষতিও তো কম হয়নি। কক্সবাজার অঞ্চলে রোহিঙ্গা শিবির স্থাপনের ফলে প্রায় ১৭ হাজার একরের বেশি বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা। ফলে একদিকে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে।

পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সামাজিক ঝুঁকি তো রয়েছেই। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মাদক নিয়ে সংঘর্ষ, স্থানীয়দের অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা প্রায়শই সামনে আসে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনও এসবের সুরাহা মেলাতে পারে না।

অন্যদিকে হতাশা ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই প্রবণতা আঞ্চলিক মানব পাচার নেটওয়ার্ককে আরও সক্রিয় করে তুলছে। এ ছাড়া স্থানীয় স্বাস্থ্য খাতেও ঝুঁকি বেড়েছে সমান্তরালে।

বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। সম্প্রতি মিয়ানমারের কাছে রোহিঙ্গাদের একটি বৃহৎ তালিকাও পাঠিয়েছে। মিয়ানমার ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই করেছে, যদিও বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। তা ছাড়া চীনের মধ্যস্থতায় একটি পাইলট প্রত্যাবাসন প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পে সীমিত সংখ্যক রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যে ফেরানোর পরিকল্পনা করা হয়। 

কিন্তু নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালত ও বিভিন্ন কূটনৈতিক ফোরামে দীর্ঘদিন থেকেই এই সংকট তুলে ধরা হচ্ছে।


বলা যায়, এই সংকট নিয়ে আলাপ-আলোচনা তো কম হলো না। কিন্তু এটি আদৌ সমাধানের পথে কতটুকু এগোচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী আবাসভূমিতে পরিণত হচ্ছে, সে বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন তীব্র হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কেন আটকে আছে এর উত্তর বোধহয় অনেকটাই লুকিয়ে আছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে। চীন এই অঞ্চলে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলতে চায়, যা সরাসরি চীনের ইউনান প্রদেশকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক রুটে বিকল্প পথ নিশ্চিত করতে পারবে বেইজিং। 

অন্যদিকে, ভারত ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প’-এর মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্রপথে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এটি ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট বা পুবে তাকাও নীতি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এমনকি জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংগঠন এবং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো বহুবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা, তদন্ত কিংবা কূটনৈতিক আলোচনার পরও মিয়ানমারের সামরিক সরকার তাদের অবস্থান খুব বেশি পরিবর্তন করেনি। 

তবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান অর্জনে জোরালো ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক পদক্ষেপের কোনো বিকল্প আপাতত দৃশ্যমান নয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও বাংলাদেশের এমন সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখনও গড়ে ওঠেনি, যার মাধ্যমে সরাসরি মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করে তাকে নীতিগতভাবে বাধ্য করা সম্ভব। ফলে বাস্তবতার নিরিখে ‘সফট পাওয়ার’, বিশেষত কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, বহুপক্ষীয় উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের কৌশলই এই সংকট মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।

এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের ওপর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে যত বেশি কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে, ততই ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত ও দৃঢ় উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আগ্রহকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। ভূরাজনৈতিক এই প্রতিযোগিতাকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যবহারের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে অগ্রসর হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অবশ্যই হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে। অন্যথায় এই সংকট কেবল দীর্ঘস্থায়ীই হবে না, বরং ভবিষ্যতে আরও জটিল আকার ধারণ করার আশঙ্কা থেকে যাবে।
 
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/এআর



  বিষয়:   ঈদ  রোহিঙ্গা  দেশ 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: