চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র মুকুট। তবে হিমালয়কন্যা পঞ্চগড় মানেই কি শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা? একদমই না। দেশের সর্বউত্তরের এই জেলাটি যেন প্রকৃতির এক আপন গ্যালারি, যেখানে পরতে পরতে সাজানো রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সবুজের মায়াবী রূপ। এবারের ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে যান্ত্রিক নগরজীবন থেকে মুক্তি পেতে আপনার ভ্রমণের তালিকায় শীর্ষে থাকতে পারে বৈচিত্র্যময় এই জনপদ। ঘুরে আসতে পারেন উত্তরের এ জেলাটির নানান দর্শনীয় স্থান।
ইতিহাসের পদচিহ্নে ফেরা
পঞ্চগড়ে পা রাখলেই আপনি হারিয়ে যেতে পারেন শত বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের দুনিয়ায়। মুঘল স্থাপত্যের শৈল্পিক ছোঁয়া দেখতে যেতে পারেন আটোয়ারীর মির্জাপুর শাহী মসজিদে। আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে পর্যটকরা ভিড় করেন বারো আউলিয়া মাজারে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন পুরাকীর্তির মধ্যে রয়েছে গোলকধাম মন্দির, জগবন্ধু ঠাকুর বাড়ি এবং বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির। প্রতিটি স্থাপনার পেছনে লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
প্রত্নতত্ত্ব প্রেমীদের জন্য বড় আকর্ষণ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম প্রত্নতাত্ত্বিক নগরী ভিতরগড়। এ ছাড়াও দেড় হাজার বছরের প্রাচীন মহারাজার দিঘি আর দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর (রকস মিউজিয়াম) আপনার জ্ঞান তৃষ্ণা মেটাবে নিশ্চিত।
মহানন্দার পাড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়া
যদিও মেঘমুক্ত আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, তবে মহানন্দা নদীর তীরের সৌন্দর্য আপনাকে নিরাশ করবে না। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে বয়ে চলা মহানন্দার স্বচ্ছ জল আর নদীর বুক থেকে শ্রমিকদের পাথর উত্তোলনের দৃশ্য এক অনন্য আবহ তৈরি করে। গোধূলি বেলায় নদীর পাড়ে বসে ঝিরিঝিরি বাতাসে সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করা কঠিন।
সমতলে সবুজের গালিচা
সিলেট বা চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ের ঢালু নয়, বরং দিগন্তজোড়া সমতলের বুকে সবুজ চা বাগান পঞ্চগড়কে দিয়েছে এক ভিন্ন পরিচিতি। কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট বা আনন্দধারা রিসোর্টের ভেতর দিয়ে হাঁটলে মনে হবে আপনি কোনো এক সবুজের রাজ্যে এসে পড়েছেন। গত দুই যুগ এই চা বাগানগুলো পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
চতুর্দেশীয় বাণিজ্যের দুয়ার : বাংলাবান্ধা
দেশের একমাত্র চারদেশীয় স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বাংলাবান্ধা। এখান থেকেই ভারত, নেপাল ও ভুটানের প্রবেশপথ শুরু। বর্তমানে এই স্থলবন্দরকে ঘিরে যে কর্মচাঞ্চল্য, তা পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। অদূর ভবিষ্যতে চীন যুক্ত হলে এটি হবে এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
নিরাপত্তা ও আতিথেয়তা
পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ হলো পঞ্চগড়বাসীর সরল জীবনযাত্রা আর অসাধারণ আতিথেয়তা। ভ্রমণের নিরাপত্তা নিয়ে টুরিস্ট পুলিশ পঞ্চগড় জোন থেকে জানানো হয়েছে, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনীয় স্থানগুলোতে পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহিন খসরু বলেন, উত্তরাঞ্চলের পর্যটন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র এখন তেঁতুলিয়া। সারা বছরই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। ঈদের ছুটিতে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন?
ঢাকা থেকে সরাসরি এসি/নন-এসি বাসে বা ট্রেনে করে পৌঁছানো যায় পঞ্চগড়। থাকার জন্য তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো, বেসরকারি মহানন্দা কটেজ, স্কয়ার আবাসিক, দোয়েল আবাসিক, হোটেল সীমান্তের পাড়, হোটেল হিমালয়, হোটেল কাঞ্চনজঙ্ঘা ও বনবিভাগের গেস্ট হাউস ছাড়াও বেশ কিছু মানসম্মত বেসরকারি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।
এবারের ঈদে সবুজের সতেজতা আর হিমালয়ের শীতলতা গায়ে মাখতে পঞ্চগড় হতে পারে আপনার শ্রেষ্ঠ পছন্দ। রং, সৌরভ আর ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধনে আপনার ঈদের আনন্দ হোক আরও সার্থক।
সময়ের আলো/জোই/এফআর