মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ সারা বিশ্বকে জ্বালানি সংকটে ফেলেছে। সর্বত্র জ্বালানি তেলের দাম প্রায় আকাশছোঁয়া বাড়তি খরচ বহন করতে হিমসিম খাচ্ছে কোটি কোটি পরিবার। তবে জার্মানির ফেল্ডহাইম গ্রামের মানুষের এসব দুশ্চিন্তা নেই।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে জ্বলানি নিয়ে আতঙ্ক বেড়েছে। কিন্তু জার্মানির ছোট্ট গ্রাম ফেল্ডহাইমের বাসিন্দারা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। এ গ্রামের বাসিন্দা ইয়েন্স নয়মানের গেমিং সেটআপের সঙ্গে রয়েছে চারটি স্ক্রিন ও একটি কনসোল।
তিনি বলেন, আমার পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে বছরে প্রায় দুই হাজার ৪০০ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করতাম। এসব প্রযুক্তির জন্য তো প্রচুর বিদ্যুৎ দরকার। এ কারণে আগের বাড়িতে বিদ্যুতের খরচ বাড়ছিল হু হু করে। কিন্তু এখন তিনি স্বল্প খরচে বিদ্যুতের জন্য পরিচিত গ্রাম ফেল্ডহাইমের বাসিন্দা। ২০২৪ সালে এ গ্রামে আসার পর থেকে ইয়েন্স নয়মান বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামান না, কারণ জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, কারণ, এখন (বিদ্যুতের) খরচ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পরও ইউরোপে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল। তখনও ফেল্ডহাইমে সেই ধাক্কা লাগেনি। সংকটের চরম পর্যায়ে জার্মানিতে বিদ্যুতের গড় দাম প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় প্রায় ০.৪৫ ইউরো (০.৫০ ডলার) পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বার্লিন থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার (৫১ মাইল) দূরের ফেল্ডহাইম গ্রামে বিদ্যুতের দাম অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল।এটা সম্ভব হয়েছে গ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কারণে।
ইয়েন্স নয়মান মনে করেন, ফেল্ডহাইমে এমন জিনিস আরো বেশি করে তৈরি করা উচিত, যা তার বিদ্যুতের বিল কম রাখছে৷ তার ইঙ্গিত সারা গ্রামে ছড়িয়ে থাকা উইন্ড টারবাইনগুলোর দিকে৷ তার বাড়ির পেছনের বারান্দা থেকে দেখা যায় সেগুলো মৃদুভাবে ঘুরছে আর ঘুরতে ঘুরতে কমাচ্ছে বিদ্যুতের বিল বাড়ার আশঙ্কা।
জ্বালানি সংকট আবার যখন তীব্র হচ্ছে, জার্মানিতে নবায়নযোগ্য শক্তির বিস্তার হয়ে পড়ছে মন্থর, তখন ফেল্ডহাইমের সবুজ রূপান্তর থেকে অনেকেই কিন্তু শিক্ষা নিতে পারে।
যেভাবে সস্তায় জ্বালানি পায় ফেল্ডহাইমের মানুষ : গল্পের শুরু ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে৷ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তরুণ ছাত্র মিশায়েল রাশেমান ফেল্ডহাইমে তখনই অপার সম্ভাবনা দেখতে পান। জার্মানির এই সমতল অংশের তুলনায় কিছুটা উঁচু জায়গায় অবস্থিত গ্রামটিতে যেভাবে বাতাস বয়ে যায়, দেখে মনে হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তা একেবারে আদর্শ। গ্রামের কাছেই ছিল একটি বিদ্যুতের লাইন। মিশায়েল রাশেমানকে এ বিষয়টি আরও আশাবাদী করলো৷।
তবে সমস্যাও ছিল অনেক। সাবেক পূর্ব জার্মানির এই গ্রামীণ জনপদ তখন অন্যরকম এক বাস্তবতার মুখোমুখি। রাশমানের স্মৃতিচারণে সেই সময়টা উঠে এলো এভাবে, সবকিছু ভেঙেচুরে গিয়েছিল— চাকরি চলে গিয়েছিল অনেকের। (কাজের জন্য) মানুষকে আরো দূরে যাতায়াত করতে হচ্ছিল এবং তেমন কিছুই হচ্ছিল না
রাশেমান ওই পরিস্থিতিতে যখন চারটি উইন্ড টারবাইনের প্রস্তাব নিয়ে ফেল্ডহাইমে হাজির হলেন, গ্রামের মানুষ তাতে নতুন কিছুর আনন্দ পেলো। স্থানীয় সাধারণ মানুষদের তো আকৃষ্ট করলোই, টিভি স্টেশনগুলোরও দৃষ্টি আকর্ষণ করল টারবাইনগুলো।
রাশেমান এবং তার স্ত্রী ততদিনে এনার্জিকুয়েলে নামের একটি জ্বালানি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ধীরে ধীরে ফেল্ডহাইমবাসীরাও যুক্ত হতে থাকেন এনার্জিকুয়েলের সঙ্গে।
স্থানীয় সরকার, গ্রামবাসী এবং কৃষক সমবায় (ফেল্ডহাইমের বেশিরভাগ জমি দেখাশোনা করেন তারা) মিলে তারপর এমন এক উপায়ে কাজ শুরু করলেন যাতে বাড়ির ওপর টার্বাইনের কোনো ছায়া না পড়ে।
ফেল্ডহাইমের বাসিন্দা ও স্থানীয় কৃষি সমবায়ের প্রধান জেবাস্তিয়ান হার্বস্ট জানান, ওই পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনাই ছিল গ্রামবাসীদের এ উদ্যোগে শামিল হওয়ার অন্যতম কারণ।
হার্বস্ট ডয়চে ভেলেকে বলেন, এটি এমন এক কাঠামো, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আরও উইন্ড টারবাইন যুক্ত করা হয়েছিল, তবে বাসিন্দাদের সবসময় সে বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে, তাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ফেল্ডহাইমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার : ফেল্ডহাইমের জ্বালানি পরিকাঠামো এরপর উইন্ড ফার্মের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। হার্বস্টের কৃষি সমবায় একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট চালু করার জন্য ২০০৮ সালে এনার্জিকুয়েলের সঙ্গে কাজ শুরু করে। সে এমন এক সময়, যখন ইউরোপের কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ার কষ্টে ভুগছেন। ফেল্ডহাইমের কৃষকদের কাছে তাই বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট হয়ে গেল আয়ের নতুন উৎস।
হার্বস্ট বলেন, এর ফলে আমরা আমাদের কর্মী বাহিনীকে সুরক্ষিত করতে পেরেছি এবং তাদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি। সেই বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট এখন গবাদি পশুর মল, ভুট্টা এবং গুড়ো শস্য থেকে বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপন্ন করে।
এখন বছরে শত শত মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ফেল্ডহাইম গ্রাম৷ ফেল্ডহাইমের মানুষদের প্রয়োজনের চেয়ে তা অনেক বেশি।আসলে মোট উৎপাদিত শক্তির এক শতাংশেরও কম ফেল্ডহাইম গ্রামে ব্যবহৃত হয়, বাকিটা চলে যায় জাতীয় গ্রিডে।
স্বল্প খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার স্বস্তি : উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯৯% জাতীয় গ্রিডে চলে যাওয়ায় মাঝে মাঝে নিজেদের উৎপাদন করা বিদ্যুৎ গ্রামবাসীকে কিনতেও হতো। তখন গ্রিড ফি ও সারচার্জ দিতে হতো৷ তাই গ্রামের পাওয়ার গ্রিডের অংশটি কিনে নিতে চেয়েছিল এনার্জিকুয়েলে।
সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ২০১০ সালে স্থানীয় সরকারের অংশীদারিত্বে নতুন একটি গ্রিড তৈরি করে এনার্জিকুয়েলে।
তাতে গ্রামবাসীরা আরো উদ্বুদ্ধ হলেন। প্রতিটি পরিবার তাদের নিজস্ব তাপ সরবরাহ-ব্যবস্থা তৈরি করতে রাষ্ট্রীয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিলের সঙ্গে নিজেরাও তিন হাজার ইউরো করে বিনিয়োগ করলো। এরই সুফল পাচ্ছে ফেল্ডহাইম। জার্মানির ১৮০টি জৈবশক্তিচালিত গ্রামের মধ্যে ফেল্ডহাইম এখন একমাত্র গ্রাম যেখানে রয়েছে সম্পূর্ণ স্বাধীন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা।
এই স্বাধীন সরবরাহ ব্যবস্থার কারণেই ফেল্ডহাইমে জ্বালানির খরচ এত কম। জার্মানির অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ যেখানে গড়ে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টার জন্য প্রায় ০.৩৫ ইউরো খরচ করে, সেখানে ফেল্ডহাইমবাসীর খরচ মাত্র ০.১২ ইউরো৷
ফেল্ডহাইম যে কারণে সফল : কিছু বিষয় ফেল্ডহাইমের সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে৷ গ্রামটি খুব ছোট এবং গ্রামের মানুষ পরস্পরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ফলে গ্রামবাসীদের সংগঠিত করা সহজ, সংযোগকারী বিদ্যুতের লাইনগুলোও ছোট হওয়ায় উইন্ড ফার্ম থেকে বাড়ি পর্যন্ত বাড়ি পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করাও কম কষ্ট ও ব্যয়সাধ্য।
সূত্র : ডয়েচে ভেলে
সময়ের আলো/আআ