ইরানে সম্ভাব্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে মোসাদের মূল্যায়নকে ঘিরে ইসরায়েলের রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। সংস্থাটির প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার পূর্বাভাস এবং তা ঘিরে সাম্প্রতিক সমালোচনা দেশটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
ইসরায়েলের মন্ত্রিসভাকে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নে বার্নিয়া উল্লেখ করেছিলেন, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন ঘটাতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। যদিও কয়েক মাসের মধ্যেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি, তবে সেটিকে কম সম্ভাবনাময় বলে বিবেচনা করা হয়। তার এই মূল্যায়ন ছিল বিভিন্ন শর্ত, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেনামী সূত্রের বরাতে অভিযোগ উঠেছে, বার্নিয়া নাকি ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে অতিরিক্ত আশাবাদী ধারণা দিয়েছিলেন, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। যদিও বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কারণ, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য এখনো দৃশ্যমান না হওয়ায় দায় চাপানোর প্রবণতা বাড়ছে।
সূত্রগুলোর দাবি, এসব তথ্য ফাঁসের পেছনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মহল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহযোগী গোষ্ঠী কিংবা ইসরায়েলের সামরিক কাঠামোর ভেতরের অংশ জড়িত থাকতে পারে। বর্তমানে এই তিন পক্ষই চাপে রয়েছে—কেন এত প্রস্তুতি সত্ত্বেও ইরানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি, সেই প্রশ্নে।
এদিকে ইসরায়েলের চ্যানেল ২৪-র অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘উভদা’ এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বার্নিয়ার কিছু মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরানের ভেতরে বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ উসকে দেওয়া সম্ভব হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিলেন তিনি। তবে একই সঙ্গে তিনি যে শর্ত ও সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলেন, সেগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলেও সমালোচনা রয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও উল্লেখ করা হয়, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে বেশি আশাবাদী দৃষ্টিতে দেখেছিলেন এবং এমন একটি কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, যা অন্য কিছু গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এতে করে কৌশলগত ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী শুরু থেকেই তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে সরাসরি কোনো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মোসাদের পরিকল্পনায় ইরানের অভ্যন্তরে অসন্তোষ উসকে দেওয়া, বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করা এবং আঞ্চলিক শক্তির মাধ্যমে চাপ তৈরি করার মতো কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা গেছে। বিশেষ করে উত্তর ইরাকভিত্তিক কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এমন পদক্ষেপে অনীহা দেখিয়েছেন, যা দুই মিত্র দেশের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্যকে স্পষ্ট করে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট-এর সময় থেকেই “ডেথ বাই অ্যা থাউজেন্ড কাটস” কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছিল। এই কৌশলের লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি সংকট ও পানি সমস্যাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ বাড়লেও তা এখনো শাসনব্যবস্থা পতনের দিকে যায়নি। ফলে বাস্তবতা এবং প্রত্যাশার মধ্যে একটি বড় ফাঁক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এ ইস্যুতে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা মোসাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে চলমান বিতর্ক ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এটি কেবল একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নের প্রশ্ন নয়, বরং ইসরায়েলের সামগ্রিক কৌশল, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
/ইউএমএইচ