স্বাধীনতা মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা। পরাধীন ব্যক্তি ও জাতি মাত্রই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারে, স্বাধীনতা কত বড় নেয়ামত। ইসলামেও স্বাধীনতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয় হিসেবে ঘোষিত। স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষায় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক মানবসন্তান ফিতরাত তথা স্বভাবজাত ধর্মের ওপর জন্মগ্রহণ করে’ (বুখারি : ১৩৫৮)। এই ফিতরাতের মধ্যেই স্বাধীনতার মর্মকথা নিহিত।
মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন। প্রত্যেক মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সহজাত এমন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য কারও কাছে নতি স্বীকার করতে চায় না। তা ছাড়া ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কোনো প্রকারের, কোনো ধরনের পরাধীনতা ইসলামে সমর্থন করে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে মুক্ত করে তাদের, তাদের গুরুভার হতে ও শৃঙ্খল হতে যা তাদের ওপর ছিল, তাই যারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং যে নূর তাঁর সঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে এর অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা আরাফ : আয়াত ১৫৭)
রাসুল (সা.) একটি স্বাধীন ভূখণ্ড লাভের জন্য কঠোর সাধনা করেছিলেন। পৃথিবীতে চির সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর তিনি ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে সে স্বাধীনতার বিস্তৃতি ও পূর্ণতা অর্জিত হয়েছিল। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে চিন্তা ও মত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ দিয়ে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বতোভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কল্যাণমূলক আরব রাষ্ট্র পৃথিবীর ইতিহাসে একটি চিরন্তন আদর্শের উদাহরণ হয়ে আছে।
আরও পড়ুন
স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি স্বাধীনতা রক্ষায়ও রাসুল (সা.) জোরালো ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি হিজরত করার পর মদিনাকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবে গণ্য করেন এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাঁর জীবনের অনেক প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য। তিনি স্বাধীনতা অর্জন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবনদানকে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করেন।
১৯৭১-এ পাকিস্তানি শোষকদের কবল থেকে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ত্রিশ লাখা শহিদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। নিজেদের জীবন বাজি রেখে প্রাণপণ লড়াই করে এ দেশের মাটি ও মানুষকে স্বাধীন করেছেন তারা। যারা দেশের জন্য, দেশের ভালোবাসা হৃদয়ে ধারণ করে মজলুম জনতার দাবি আদায়ের স্বার্থে লড়াই করেছিল, তাদের লড়াই ছিল আল্লাহর পথে লড়াই করারই নামান্তর। আল্লাহ তায়ালা শহিদদের সম্মানার্থে কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের তোমরা মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত। কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৫৪)
আমাদের এই মুসলিম ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ধরে রাখতে হবে। শহিদদের আত্মদানকে চির সমুন্নত রাখতে হলে দেশের সার্বভৌমত্বের হেফাজত করতে হবে। আর ইসলামি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা নিয়জিত থাকেন, তাদের মর্যাদা অনেক বেশি। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘একদিন ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া পৃথিবী ও তার অন্তর্গত সবকিছুর চেয়ে উত্তম।’ অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তার আমল আর বৃদ্ধি পেতে পারে না। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে ব্যক্তি কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার আমল কেয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং কবরের প্রশ্নোত্তর থেকেও সে মুক্ত থাকবে।’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)
সার্বভৌমত্ব ধরে রাখার পাশাপাশি দেশ গঠন, এর উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্যও কাজ করতে হবে। এ জন্য দেশপ্রেমের বিকল্প নেই। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ স্থান থেকে দেশের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও সুনামের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য ত্যাগের মানসিকতা অর্জন করতে হয়। আর এমন মানসিকতা সৃষ্টির অন্যতম উপাদান হলো স্বদেশপ্রেম। আরবি ভাষায় প্রবচন আছে- ‘হব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান’। যার অর্থ- দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ মাতৃভূমিকে খুব ভালোবাসতেন। জন্মভূমি মক্কার প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসার কথা আমাদের জানা। প্রতিপক্ষ মুশরিকদের হিংস্রতায় রাসুল (সা.) মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে যেতে বাধ্য হন। তিনি যখন পবিত্র মদিনার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন তখন পেছন ফিরে প্রিয় মাতৃভূমির দিকে তাকাচ্ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হে মক্কা প্রিয় জন্মভূমি আমার! যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বাধ্য না করত আমি কোনোদিন তোমাকে ছেড়ে যেতাম না’ (বুখারি ও মুসলিম)। নিজ দেশের প্রতি নবীজি (সা.)-এর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরাও আমাদের দেশের প্রতি শ্রদ্ধাসহ ভালোবাসা রাখি। যোগ্য, সৎ ও নিষ্ঠাবান নাগরিক তৈরি করে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ হই। তবেই সার্থক ও সফল হবে একাত্তরে লাখো বাঙালির জীবনদান।
এএডি/