২০ সেট ডেমু ট্রেনের পর ১২৫ লাগেজ ভ্যান রেলওয়ের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব কেনাকাটায় চলেছে বড় অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য। লাগেজ ভ্যানে পণ্য পরিবহন হয় না। পাহাড়তলীতে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে ডেমু ট্রেন। এসব অপারেশনাল কাজে যুক্ত করার পর থেকে প্রশ্ন উঠেছে প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। আলোচনা হচ্ছে সিন্ডিকেটের নানা কারসাজি। অভিযোগ আছে, সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিব-সুজন সিন্ডিকেটের কারসাজিতেই কেনা হয় লাগেজ ভ্যান-ডেমু ট্রেন। পণ্য কিংবা যাত্রী বহনে কোনো কাজে আসেনি। উল্টো রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রতি মাসে বিপুল টাকা গচ্চা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইঞ্জিন কোচ সংকটে ধুঁকছে রেলওয়ের পূর্ব-পশ্চিম দুই অঞ্চল। ইঞ্জিন সংকটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। আবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পরিচালনা করা যাচ্ছে না আন্তঃনগর ট্রেন। নীতি নির্ধারকরা আছেন অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল কেনাকাটায়। প্রকল্পের সমীক্ষার নামে চলে নয়ছয়। এতে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই চলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা। এতে রেলওয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। পাল্লা ভারী হচ্ছে লোকসানের।
সূত্র জানায়, পণ্য পরিবহনের আয় বাড়াতে দেড় বছর আগে ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা হয় ১২৫টি লাগেজ ভ্যান। আর স্বল্প দূরত্বে নিরাপদ চলাচলে এক যুগ আগে কেনা হয় ডেমু ট্রেন। ব্যয় হয় ৬৫০ কেটি টাকা। দুই প্রকল্পের অধীনে কেনা হাজার কোটি টাকার লাগেজ ভ্যান আর ডেমু ট্রেন কাজে আসছে না। অচল পড়ে আছে রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনায়। সচল কিছু লাগেজ ভ্যান ট্রেনে যুক্ত থাকলেও পণ্য পরিবহন তেমন হয় না। এসব দিয়ে রেলওয়ের আয় তো বাড়েইনি। উল্টো প্রতিদিন বিপুল অর্থ রক্ষণাবেক্ষণে গচ্চা যাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় এসব পরিবহন কেনার দায় নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে যাত্রী সেবার পরিবর্তে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট অর্থ নয়ছয় করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে কেনে লাগেজ ভ্যান-ডেমু ট্রেন। একটি দুর্নীতিবাজ চক্র জড়িত এসব কেনাকাটায়। চক্রের সদস্যরা ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে কেনাকাটার নামে অর্থ অপচয়ের তদন্ত আটকে দেন। রেলওয়ের বিভিন্ন স্তরের সাধারণ কর্মকর্তারা বলছেন, রেলওয়ের দীর্ঘদিনের দাবি কোচ/বগি ও ইঞ্জিনের সংস্থান। কোচ বগি যত বেশি কেনা হবে তত বেশি নতুন নতুন ট্রেন চলবে। যাত্রীদের ট্রেন যাত্রায় আসন সংকট হবে না। কিন্তু ইঞ্জিন কোচ/বগি বাদ দিয়ে কেন লাগেজ ভ্যান-ডেমু ট্রেন কেনা হয় তা নিয়ে সবসময় প্রশ্নের যেন শেষ নেই। এসব ঠেকাতে সাধারণ রেল কর্মীর করার কিছুই নেই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার বিরুদ্ধে কথা বললেও নেমে আসে খড়গ।
আরও পড়ুন
রেলওয়ের নতুন কনসেপ্ট বা ধারণা হিসেবে লাগেজ ভ্যান কেনা হয়েছিল। যাত্রীদের চাহিদা বা আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা যাচাই করা হয়নি। ভ্যান নামে হলেও এসব বিশেষ ধরনের রেল কোচ। যা পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এসব লাগেজ ভ্যানে দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য পরিবহন করা যায়। এ জন্য বহরে আছে ২৫টির মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাগেজ ভ্যান। যা রেফ্রিজারেটর লাগেজ ভ্যান নামে পরিচিত। কেনার পর থেকে সব রেফ্রিজারেটরই পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো ধরনের কার্যকর সমীক্ষা চালানো হয়নি এসব কেনায়। ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই ছাড়াই ভ্যানগুলো আমদানি করায় এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। লাগেজ ভ্যানগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার চিন্তাভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। তবে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ধারণা বেসরকারি খাতে দিলেও লসের ঘানি টানতে হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা সময়ের আলোকে বলেন, শতাধিক লাগেজ ভ্যান আছে রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম দুই অঞ্চলে। এর মধ্যে কিছু লাগেজ ভ্যান সচল আছে। ব্যবহারও করা হচ্ছে। তবে অল্পসংখ্যক ৮-১০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাগেজ ভ্যান এখন ব্যবহার হচ্ছে না।
লাগেজ ভ্যান কোনো কাজে আসছে না। দরকার না থাকা সত্ত্বে¡ও কেন কেনা হয়েছে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে এসব ভ্যান দিয়ে ট্রেনে পণ্য পরিবহনের চিন্তাভাবনা ছিল। কিন্তু নানা সংকটের কারণে প্রত্যাশিত ফলাফল এখনই হয়তো মিলছে না। ভবিষ্যতে লাগেজ ভ্যানে আয় বাড়বে সন্দেহ নেই।
চীন থেকে কেনাকাটায় যত অভিযোগ : লাগেজ ভ্যান ক্রয়ে ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট চীনের একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার চুক্তি করে রেলওয়ে। আর এসব লাগেজ ভ্যান কেনা হয় ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং অপারেশন উন্নয়ন কারিগরি সহায়তা’ প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পের আওতায় ৭৫টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ লাগেজ ভ্যানের সরবরাহ পৌঁছে যায় স্বল্প সময়ে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ধাপে ধাপে নতুন লাগেজ ভ্যানগুলো রেলের বহরে যুক্ত হয়। এরমধ্যে ছিল ২৫টি রেফ্রিজারেটর লাগেজ ভ্যান।
প্রতিটি মিটারগেজ ভ্যানের দাম ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। প্রতিটি ব্রডগেজ ভ্যানের দাম ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। প্রতিটি ভ্যানের পণ্য বহনের সক্ষমতা ১০ টন। ডকুমেন্টারি বা কাগজে-কলমে ব্যবহার দেখানো হলেও এসব লাগেজ ভ্যান রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনায় পড়ে আছে। এর মধ্যে ২৫ রেফ্রিজারেটর লাগেজ ভ্যান বহরে যুক্ত হলেও একদিনও ব্যবহার হয়নি। অথচ সাধারণ লাগেজ ভ্যানের চেয়ে এসবের দাম অনেক বেশি। ব্যবহার না হলেও রক্ষণাবেক্ষণ খাতেই প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়।
লাগেজ ভ্যান থেকে প্রত্যাশিত আয় না থাকা কিংবা অব্যবহৃত পড়ে থাকা নিয়ে নানা তথ্য মিলেছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল লাগেজ ভ্যান শুধু মেইল ট্রেনের পাশাপাশি আন্তঃনগর ট্রেনে যুক্ত করা হবে। কিন্তু আন্তঃনগর ট্রেন সব স্টেশনে থামে না। আবার যেখানে ট্রেন থামে সেখানে বিরতি থাকে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিট। এতে স্বল্প সময়ে পণ্য ওঠানামার সময় পাওয়া যায় না। ফলে এই পরিকল্পনাও কার্যকর হয়নি। যাত্রাপথে বিরতির কম সময় আন্তঃনগর ট্রেনে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়। আর এই বাধার কারণে লাগেজ ভ্যান পরিণত হয়েছে গলার কাঁটায়।
লাগেজ ভ্যান থেকে কেন সুফল মেলেনি তা নিয়ে আছে নানা মত। আছে অসম পরিবহন ভাড়ার নানা কাহিনি। লাগেজ ভ্যানে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে প্রতি কেজি পণ্যের ভাড়া ২ টাকা ৩৬ পয়সা। একই পণ্য সড়কপথে পরিবহন করলে ভাড়া পড়ে ১ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে ২ টাকা। চট্টগ্রাম কিংবা যশোহ থেকে ঢাকায় সবজি পাঠাতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে ২ টাকা। অথচ ট্রেনে পাঠাতে খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে ৪ টাকা। এ জন্য লাগেজ ভ্যান ব্যবহার না হওয়া বা পরিত্যক্ত হওয়ার পথে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীনকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি। পরে মেসেজ দেওয়া হলে তিনি জানান, ঢাকায় সচিবের সঙ্গে মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন।
লাগেজ ভ্যানগুলো ব্যবহার বেশি হয় রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, লাগেজ ভ্যান ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত আছে। কিন্তু এসব ভ্যানে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করার কথা সেই পরিমাণ পণ্য পাওয়া যাচ্ছ না। পণ্য পরিবহন করে যে পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করার কথা ছিল তাও হচ্ছে না।
শ্বেত হস্তি ডেমু ট্রেন : ২০১০ সাল থেকে স্বল্প দূরত্বে উন্নত যাত্রীসেবার লক্ষ্যে ডেমু ট্রেনের উদ্যোগ নেয় রেলওয়ে। এরপর চীন থেকে কেনা হয় ২০টি ডেমু ট্রেন। এসব ট্রেনের ব্যয় ছিল ৬৫৪ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি ঢাকঢোল পিটিয়ে ডেমু ট্রেনের উদ্বোধন করা হয়। এসব ডেমু ট্রেন মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই বিকল হতে শুরু করে। এরপর ১ মাস চালু থাকলে ২ মাস অচল পড়ে থাকে। এই অবস্থায় ছিল কয়েক বছর ধরে। নতুন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষক্ষ জনবল ছিল না ডেমু পরিচালনায়। এখন ২০ সেট ডেমু ট্রেনের স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ের ওয়ার্কশপ। কয়েক বছর ধরে পড়ে আছে সেখানে। অন্তত তিন বছর আগেই স্থায়ীভাবে অচল হয়ে পড়ে সব ট্রেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময় ট্রেনগুলো থেকে ভালো সার্ভিস পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই কিংবা কার্যকর সমীক্ষা করা হয়নি ডেমু কেনার ক্ষেত্রে। যাত্রীদের জন্য কতটুকু উপকার হবে তাও যাচাই করা হয়নি। যাত্রী উপকারের চেয়ে কেনাকাটায় কমিশনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ৬৫০ কোটির ডেমু ট্রেন থেকে কোনো ফলাফল মেলেনি।
রেলওয়ে যান্ত্রিক বিভাগের প্রকৌশলীরা জানান, ডেমু ট্রেন চালুর পর থেকে বড় ধরনের ত্রুটির আভাস মিলেছিল। কয়েক বছরের মধ্যে ইঞ্জিনে অস্বাভাবিক শব্দ, অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া বের হওয়া শুরু হয়। তা ছাড়া ইঞ্জিন অস্বাভাবিক গরম হয়ে যাওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। যান্ত্রিক এসব সমস্যা এক পর্যায়ে চরমে পৌঁছে। এরপর ট্রেনগুলো একে একে বিকল হতে থাকে। কেনার আগে সমীক্ষায় বলা হয়েছিল ডেমু ট্রেনের দুদিকেই ইঞ্জিন থাকায় আলাদা ইঞ্জিনের দরকার হবে না। বডি হালকা হওয়ায় জ্বালানিও লাগবে কম। সহজেই কম-বেশি করা যাবে গতি ঝাঁকুনিও হবে কম। স্বল্প দূরত্বে ট্রেনগুলো পরিচালনা করে প্রচুর যাত্রী পরিবহন করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে এসব স্বপ্নই থেকে গেছে।
ডেমু ট্রেনের ভবিষ্যৎ কী এ প্রশ্নে রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা সময়ের আলোকে বলেন- এসব ট্রেন আর চলছে না। বেশিরভাগ পড়ে আছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার বিভিন্ন স্থাপনায়। ভবিষ্যতে ফের সচল করা যাবে কি না এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। ট্রেনগুলো স্বল্প দূরত্বের বলা হলেও দীর্ঘপথে এমনকি চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত চালানো হয়েছে। এতে কারিগরি ত্রুটি বেড়েছে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ডেমু ট্রেনগুলো স্বল্প দূরত্বেই পরিচালিত হয়। তবে কিছু কিছু ট্রেন দীর্ঘপথে চালানো হয়। এ জন্য কারিগরি ত্রুটি হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই।
কেনাকাটায় সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিব-সুজন চক্র : ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রেলমন্ত্রী ছিলেন মুজিবুল হক মুজিব। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রেলমন্ত্রী ছিলেন মো. নুরুল ইসলাম সুজন। আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মন্ত্রীর আমলেই কেনাকাটা হয় ডেমু ট্রেন আর লাগেজ ভ্যান। রেলমন্ত্রী সুজনের আমলে রেলে দুর্নীতি বেশি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সুজনের আস্থাভাজন কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে লাগেজ ভ্যান কেনার প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়। পরে কেনা হয় অপ্রয়োজনীয় শতাধিক লাগেজ ভ্যান। এসব লাগেজ ভ্যানও এখন পরিণত হয়েছে শ্বেত হস্তিতে। কিছু কিছু ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পণ্য পরিবহন হয় না। ট্রেনে যুক্ত থাকা প্রতিটি লাগেজ ভ্যান খাতে প্রতিদিন বিপুল অর্থ গচ্চা যাচ্ছে। আর যেসব লাগেজ ভ্যান ব্যবহার ছাড়া পড়ে আছে রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও বিপুল অর্থ গচ্চা যাচ্ছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক মুজিবের আমলে কেনা হয় ডেমু ট্রেন। এসব ট্রেন চলাচল শুরুর অল্প দিনের মধ্যে দেখা যায় ভালো ফল মিলছে না। এসব ট্রেন পরিচালনা করে লাভের পরিবর্তে বিপুল অর্থ গচ্চা দিয়ে এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। এই প্রকল্পে সুফল না মেলার পর আবার লাগেজ ভ্যান কেনা হয়। একই প্রক্রিয়ায়। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করেই কেনা হয় এসব লাগেজ ভ্যান। যার কারণে রেলওয়ে বিপুল অর্থ গচ্চা দিচ্ছে। অথচ আমাদের কেনা দরকার বগি কোচ ও ট্রেন ইঞ্জিন। এসব সংকট এখনও দূর হয়নি। কর্মকর্তারা আছেন কেনাকাটার কমিশন ভাগাভাগিতে।
রেলওয়ের কারিগরি পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কুদরত- ই-বারি খোকন বলেন, লাগেজ ভ্যানগুলো পাহাড়তলীতে প্রায় সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখা যায়। মেরামতের জন্যও আনা হয়। ডেমু ট্রেন মেরামত কারখানায় পড়ে আছে কয়েক বছর ধরে। আসলে এসব দরকার ছিল না। সিন্ডিকেটের কেউ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে এসব কিনেছে বলে আমি মনে করি। যাত্রীদের কোনো উপকারে আসেনি। কেনাকাটায় সিন্ডিকেটের কারসাজিতে লাগেজ ভ্যান কেনার কারণে রেলওয়ে প্রতিদিন বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ছে।
মার্শালিং ইয়ার্ডে সারি সারি লাগেজ ভ্যান : চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাট ওভার ব্রিজের সামনের দিকে রেললাইন ধরে কিছু দূর এগোলে চোখে পড়ে মার্শালিং ইয়ার্ড। এই ইয়ার্ডে আছে ট্রেনের কোচ থেকে লাগেজ ভ্যান সবই। সরেজমিন দেখা যায়, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা ট্রেনে যুক্ত করার জন্য রাখা বিভিন্ন কোচের পাশে সারি সারি লাগেজ ভ্যান। দেখতে ট্রেনের বগি কোচের মতো হলেও ভেতরের চিত্র অন্যরকম। যাত্রী পরিবহনের মতো আসন নেই। পুরো অংশে আছে পণ্য রাখার ব্যবস্থা।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যদের কড়া নজরদারিতে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর দেখতে দেওয়া হয় লাগেজ ভ্যান। কর্তব্যরত আরএনবি সদস্যরা জানান, এসব লাগেজ ভ্যান অনেক দিন ধরে পড়ে আছে মার্শালিং ইয়ার্ডে। মাঝেমধ্যে ট্রেনে যুক্ত করতে দেখি। কিন্তু বেশিরভাগ সময় এই ইয়ার্ডেই পড়ে থাকে। অল্পদিন আগে কেনা লাগেজ ভ্যানগুলো এখনও দেখতে চকচকে ঝকঝকে। অথচ ট্রেনে ব্যবহার তেমন হয় না। ব্যবহার হলেও পণ্য মেলে না। মার্শালিং ইয়ার্ডে কর্মরত রেলওয়ের কর্মীরাই বলছেন এভাবে শত কোটি টাকার পণ্য অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের তদারকি নেই। অপরদিকে পাহাড়তলী মেরামত কারখানার লোকোশেডের আশপাশেই পড়ে আছে ডেমু ট্রেন। মাসের পর মাস রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে বাইরের অংশ। ব্যবহার না হওয়ায় বেশিরভাগ ডেমু ট্রেন এখন আর চলাচল উপযোগী অবস্থায় নেই।
এএডি/