মানুষের স্পর্শ শুধুই একটি শারীরিক অনুভূতি নয়, এটি আমাদের মনের শান্তি ও শরীরের সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গবেষণা দেখিয়েছে, মানুষের আলিঙ্গন বা কোমল স্পর্শ শরীরের ভেতরের বিশেষ স্নায়ুগুলোকে সক্রিয় করে, যা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ (বন্ধন তৈরির হরমোন) ও ‘এন্ডোরফিন’ (সুখ ও স্বস্তি দেওয়ার হরমোন) ছড়িয়ে দেয়।
এটি কেবল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়—বাস্তব জীবনেও স্পর্শের শক্তি অসাধারণ প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের সেন্ট জেমস হাসপাতালে এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল। নাথান নিউবি (৩৫) নামে এক রোগী জানতে পারেন, মোহাম্মদ ফারুক নামের একজন সন্ত্রাসী হাসপাতালে বোমা ফাটিয়ে নার্সদের হত্যা করতে চাচ্ছেন।
নিউবি যখন ফারুকের মুখোমুখি হন, তখন তিনি ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু নিউবি শান্ত থাকার চেষ্টা করে ফারুকের সঙ্গে কথোপকথন চালান। অবশেষে ফারুক নিউবিকে আলিঙ্গনের জন্য অনুরোধ করেন। নিউবি রাজি হন। আলিঙ্গনের পর ফারুক বলেন, আমার মন বদলানোর আগে পুলিশকে ডাকুন। এর ফলে বড় একটি রক্তপাত রোধ হয়। পরে ফারুককে ৩৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং নিউবিকে সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘জর্জ মেডেল’ দেওয়া হয়।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, কখনও কখনও একটি সাধারণ আলিঙ্গনও পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারে।
স্পর্শ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মানব জীবনে স্পর্শ একটি মৌলিক চাহিদা। আমাদের প্রাইমেট পূর্বপুরুষদের আচরণ থেকেও আমরা এটি শিখেছি—বানর বা উল্লুকরা একে অপরকে মৃদুভাবে ছুঁয়ে বন্ধন ও ভালোবাসা প্রকাশ করে।
আমাদের ত্বকে থাকা সি-ট্যাকটাইল অ্যাফারেন্ট ফাইবার নামের স্নায়ু হালকা ও কোমল স্পর্শের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই স্নায়ুগুলো যখন সক্রিয় হয়, তখন তা মস্তিষ্কে আবেগ ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত অংশে সংকেত পাঠায়। ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির মুখপাত্র ডা. মাইকেল সুইফট বলেন, একটি আলিঙ্গন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্বস্তি দিতে পারে, এর জন্য আমাদের আলাদা কোনো যুক্তি বা চিন্তা প্রয়োজন হয় না।
সব স্পর্শ সমান নয়। যে স্পর্শ অন্যায় বা অপ্রয়োজনীয় হয়, যেমন বাসে কারও কনুইয়ে আঘাত, তা অস্বস্তি সৃষ্টি করে। আর প্রিয়জনের কোমল স্পর্শ মন ও শরীরকে স্বস্তি দেয়।
ডা. রবি লুখা (বিউপিএ-এর মেডিকেল ডিরেক্টর) বলেন, একটি ১০ সেকেন্ডের আলিঙ্গন শরীরকে সতেজ রাখে, হতাশা কমায় এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে সাহায্য করে। যদি আলিঙ্গন ২০ সেকেন্ড বা তার বেশি হয়, তবে তা হৃদয়ের জন্য বিশেষ উপকারী। এটি মানসিক চাপ ও রক্তচাপ কমায়।
জন্মের পর থেকেই স্পর্শের প্রয়োজন
স্পর্শের জাদু জন্মের পর থেকেই শুরু হয়। শিশু জন্মের পর বাবা-মায়ের সঙ্গে স্কিন-টু-স্কিন সংস্পর্শ রাখলে শিশুর হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের তাপমাত্রা ঠিক থাকে। এমনকি এটি শিশুর কান্না কমাতে সাহায্য করে এবং তাদের নিরাপত্তার অনুভূতি জাগায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও স্পর্শ বিশ্বাস ও আশ্বাসের প্রতীক হিসেবে কাজ করে, বিশেষ করে বিপদের মুহূর্তে। ২০০৬ সালে ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা যখন মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তখন তাদের সঙ্গীর হাত ধরলে তাৎক্ষণিক স্বস্তি পান।
২০২২ সালে জার্মান গবেষকরা ৩৬টি তরুণ দম্পতির ওপর পরীক্ষা চালান। দেখা যায়, যারা চাপের কাজ বা পরীক্ষার আগে তাদের সঙ্গীকে আলিঙ্গন করেছেন, তাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কোর্টিসল’ কম বেড়ে।
এছাড়া ২০১৭ সালের ইউসিএল-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর একজন অপরিচিত মানুষের ধীর ও কোমল স্পর্শও একাকিত্ব ও মানসিক কষ্ট কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আলিঙ্গন রোগ প্রতিরোধেও সহায়ক
স্পর্শ কেবল মন ভালো রাখে না, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সর্দি-কাশির ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার আগে দুই সপ্তাহ ধরে প্রিয়জনদের আলিঙ্গন করত, তারা সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকত। যারা আক্রান্ত হত, তারা দ্রুত সুস্থ হত।
বয়স্কদের ওপর ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি আলিঙ্গন ও স্পর্শ পেত, তাদের ‘ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন’ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও ব্যথার ঝুঁকি অনেক কম থাকত।
স্পর্শের অভাবের প্রভাব
স্পর্শের অভাব মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়ায়। কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় মানুষ স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়ে ‘টাচ ডিপ্রাইভেশন’ বা ‘ত্বকের ক্ষুধা’ অনুভব করেছিল।
মহামারির আগে থেকেই মানুষ ক্রমশ অনলাইনভিত্তিক হয়ে উঠছিল। ফোন ও স্ক্রিনের ব্যবহার সামনাসামনি আলিঙ্গনের জায়গা দখল করেছে। এর ফলে একাকীত্ব ও স্পর্শের অভাব বেড়েছে।
এই ঘাটতি পূরণের জন্য নতুন নতুন উদ্যোগও শুরু হয়েছে। ২০১২ সালে জাপানে প্রথম কাডল ক্যাফে চালু হয়, যেখানে টাকা দিয়ে কেউ নিরাপদে আলিঙ্গন, হাত ধরা বা পাশে বসার সুযোগ পেত। এখন যুক্তরাজ্যেও ‘কাডল থেরাপিস্ট’ পাওয়া যায়, যারা টাকার বিনিময়ে নির্দোষ স্পর্শ বা আলিঙ্গনের সেশন আয়োজন করেন।
একটি ছোট্ট আলিঙ্গনও দারুণ শক্তিশালী। এটি মনকে শান্ত করে, হৃদয়কে সুস্থ রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং একাকীত্ব কমায়। ব্যস্ত এই যান্ত্রিক জীবনে আমাদের উচিত এই অমূল্য আলিঙ্গনের ক্ষমতাকে আরও বেশি মূল্যায়ন করা। কেবল ভালোবাসার মানুষের কাছে নয়, প্রয়োজনে পরিচিত বা নিরীহ মানুষের কোমল স্পর্শও আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
/ইউএমএইচ