মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল–এর মধ্যে চলমান সংঘাত ২৯ মার্চে এসে টানা ৩০ দিনে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধের সূচনা হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইরানের ভেতরে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন বলে দাবি করা হয়। এর পরপরই ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে এবং তা ক্রমশ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে।
ইরান এখন শুধু ইসরায়েলের ভেতরেই নয়, বরং ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হচ্ছে। এতে সংঘাতটি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।
সৌদির ঘাঁটিতে হামলা, ‘ফ্লাইং রাডার’ বিমান ধ্বংস
এই সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক ই–৩ সেন্ট্রি বিমান ধ্বংস হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এই বিমানটি আকাশভিত্তিক সতর্কীকরণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ, যা যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং কমান্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই হামলায় অন্তত ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকটি সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বর্তমানে সক্রিয় এমন বিমানের সংখ্যা খুবই সীমিত—মাত্র ১৬টি। প্রতিটি বিমান তৈরিতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যা এর কৌশলগত গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন স্থল অভিযানের’ অভিযোগ
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার কথা বললেও অন্যদিকে গোপনে ইরানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং কোনো বিদেশি সেনা দেশটিতে প্রবেশ করলে কঠোর প্রতিরোধের মুখে পড়বে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে শিল্প স্থাপনায় হামলার দাবি
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কারখানায় হামলা চালিয়েছে। এসব কারখানার সঙ্গে মার্কিন সামরিক ও মহাকাশ শিল্পের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তারা দাবি করেছে।
আইআরজিসি আরও জানায়, এটি ছিল তাদের পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব, কারণ ওই অঞ্চল থেকেই ইরানের শিল্প অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছিল। তারা ঘোষণা দিয়েছে, ভবিষ্যতে আর ‘চোখের বদলে চোখ’ নয়—বরং আরও শক্তিশালী ও ব্যাপক আঘাত হানা হবে।
যুদ্ধে হুথিদের যোগদান ও নতুন হুমকি
ইয়েমেনভিত্তিক হুথি আন্দোলন এই সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি দিয়েছে।
এই প্রণালিটি বৈশ্বিক তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এখন যদি বাব আল-মান্দাব প্রণালি-ও অচল হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও পাকিস্তানের ভূমিকা
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলে শান্তি উদ্যোগ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসর মিলে একটি চার-পক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করেছে, যার লক্ষ্য হচ্ছে এই সংঘাত কমিয়ে আনা। পাকিস্তান উভয় পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক বড় কোনো সমাধান আসার সম্ভাবনা কম।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চাপ
ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। তাদের উন্নত ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত সীমিত হওয়ায় এখন সেগুলো বেছে বেছে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি এবং সরাসরি আঘাত হেনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযান
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সীমিত পরিসরের স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই অভিযান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হবে না; বরং বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরানের কৌশলগত পরিবর্তন
ইসরায়েলের হামলার কারণে ইরান তাদের সামরিক কমান্ড সেন্টারগুলো স্থায়ী ঘাঁটি থেকে সরিয়ে ভ্রাম্যমাণ বা অস্থায়ী স্থানে নিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। এতে করে শত্রুপক্ষের হামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে তারা।
ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা
ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে—যার মধ্যে রাডার কেন্দ্র, সামরিক কমপ্লেক্স এবং তেল আবিবের বিমানবন্দরও রয়েছে। এছাড়া তারা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত এবং একটি যুদ্ধবিমানে আঘাত করার কথাও জানিয়েছে।
হুথিদের দ্বিতীয় দফা হামলা
হুথিরা জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে দ্বিতীয় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলা ইরান ও তাদের মিত্রদের সামরিক অভিযানের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে বলে তারা দাবি করেছে।
মার্কিন সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি
সংঘাত শুরুর এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। হাজার হাজার নৌ ও মেরিন সেনা ইতোমধ্যে সেখানে পৌঁছেছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি-ও তার নির্ধারিত এলাকায় অবস্থান নিয়েছে, যা এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে অংশ নিতে সক্ষম।
এই যুদ্ধ এখন আর সীমিত পরিসরে নেই; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। এতে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—সব দিক থেকেই চাপ বাড়ছে এবং বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
/ইউএমএইচ