আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাস করে অর্থনীতিকে গতিশীল করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ। একটি রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল রাজস্ব আহরণ বা বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; বরং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা তার মৌলিক ভিত্তি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের আবির্ভাবের ফলে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য একটি ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এই পর্যায়ে সরকারকে কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে প্রধান হলো—
১. প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা;
২. নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা তথা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অনুকূল পরিবেশ তৈরি;
৩. রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধ ও নিয়ন্ত্রণ;
৪. উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়দক্ষতা নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যেমন ভালো সরকার গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনীতির ভাষায় তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক এবং টাকার মূল্য নিশ্চিত করা।
সরকারি ব্যয় সংযম ও নৈতিক নেতৃত্ব
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সরকারি অর্থ অপচয় রোধে এবং ব্যয় হ্রাসে যে প্রতীকী ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রটোকলের বরাতে সরকারি বিপুল গাড়ি বহরের পরিবর্তে নিজস্ব খরচে নিজের গাড়ি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রোটোকল ব্যয় কমানো, শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি না করা, সরকারি সম্পদ ব্যবহারে সংযম প্রদর্শন এবং বিলাসিতা পরিহার— এসব পদক্ষেপ কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; এগুলো রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় একটি Signal of Fiscal Prudence। অর্থ হলো— রাষ্ট্র বা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা, সংযম ও দায়িত্বশীলতার একটি ইঙ্গিত বা বার্তা।
তবে কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রকৃত অর্থনৈতিক সাশ্রয় অর্জনের জন্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের ক্ষেত্র— সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্প (public procurement and development expenditure)-এ মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, কারণ উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ এখানেই ব্যয় হয়। বাস্তবে দেখা যায়, প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি, অনুমোদন এবং দরপত্র আহ্বান— এই দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় ১ থেকে ১.৫ বছর সময় লেগে যায়।
এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। ফলে দরপত্র আহ্বানের সময় প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তব বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। এর ফলে দুটি অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়— প্রথমত দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত সরকার প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় বহন করতে বাধ্য হয়।
উদাহরণস্বরূপ, পূর্ববর্তী সময়ে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় ৩০-৩৫ শতাংশ কম দামে কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ জারি করার কারণে দরপত্রে মূল্য প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায়, ১০ শতাংশ অধিক কম দর দাখিল করলে সে দরপত্র অযোগ্য বলে বিবেচিত হতো। যার ফলে সরকারি ব্যয়ে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা যায়— procurement inefficiency leading to fiscal leakage।
প্রতিযোগিতা সীমিত হলে ব্যয় বাড়ে
যখন দরপত্র ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা থাকে না, তখন বাজারের স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া বিকৃত হয়ে যায়। অর্থনীতিতে এটিকে বলা হয় distorted price discovery। ফলে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় বাড়ে, সরকারি বাজেটে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হয়, করদাতাদের অর্থের অপচয় ঘটে।
এ কারণেই উন্নত অর্থনীতিগুলো সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলককে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠীর যোগসাজশে রাষ্ট্রের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি সৃষ্টি করা হয়। জমি ভরাট, রাস্তাঘাট নির্মাণ, নদী ও খাল খননের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগত কাজ— যেগুলো অর্থনৈতিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারমূল্য নিশ্চিত করার জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা সেগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা Direct Procurement Method (DPM) ব্যবহার করে বাস্তবায়ন করা হয়।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট তত্ত্ব অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রব্যবস্থা রাষ্ট্রকে সর্বোত্তম মূল্য জবাবদিহিতা এবং বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। কিন্তু যখন এই নীতি এড়িয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা কার্যত একটি rent-seeking structure সৃষ্টি করে যেখানে সীমিত গোষ্ঠী রাষ্ট্রের সম্পদ ও উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিপুল পরিমাণ বেসামরিক উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুতর নীতিগত বিচ্যুতি। কারণ, প্রতিরক্ষা বাহিনীর মূল দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা; কিন্তু যখন তাদেরকে ধারাবাহিকভাবে বেসামরিক উন্নয়ন প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন তা Institutional Mission Drift তৈরি করে, অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানের মৌলিক উদ্দেশ্য ও পেশাগত কাঠামো ধীরে ধীরে ভিন্ন দিকে সরে যেতে থাকে এবং দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই প্রক্রিয়া কেবল রাষ্ট্রের আর্থিক স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা বাহিনীর পেশাগত নিরপেক্ষতা, নৈতিক শৃঙ্খলা এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
অতএব, এই ব্যবস্থা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি বা নীতিগত দুর্বলতা নয়; বরং এটি এমন এক বিপজ্জনক প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত, যা একদিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক জবাবদিহিতা ও বাজারভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামোকে দুর্বল করে এবং অন্যদিকে প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেশাগত স্বাতন্ত্র্য ও নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে।
ফলে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের সুযোগ নষ্ট হয়। অতিরিক্ত ব্যয়, দক্ষতার ঘাটতি এবং সম্পদের ভুল বণ্টনের কারণে উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ কার্যত এমন এক অর্থনৈতিক ক্ষতিতে পরিণত হয়, যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয়, যে ব্যয়ের বিনিময়ে সমাজ সমপরিমাণ কল্যাণ বা উৎপাদনশীল মূল্য লাভ করে না।
উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির ফলে তিনটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়—
১. বাজার প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়;
২. প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়;
৩. দুর্নীতির কাঠামোগত সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এটিকে বলা হয় rent-seeking behaviour— যেখানে রাষ্ট্রের নীতিগত ফাঁক ব্যবহার করে কিছু গোষ্ঠী অযৌক্তিক অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করে।
অতএব অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক নীতি হবে—
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রব্যবস্থা শক্তিশালী করা; সরকারি ক্রয়ে ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; শুধু দুর্যোগকালীন জরুরি অবস্থায় সরাসরি ক্রয় কঠোরভাবে সীমিত করে প্রয়োগ করা; সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে যে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হবে তার অবশ্যই সেই কাজের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা থাকতে হবে। কোনোক্রমেই সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির কাজ সাবটেন্ডারে প্রদান করা যাবে না।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য কেবল রাজস্ব বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; বরং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
যদি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তা হলে উন্নয়ন ব্যয়ের বিশাল অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। সেই সাশ্রয়কৃত সম্পদ আবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা যাবে।
অতএব অর্থনীতির মৌলিক নীতি অনুসারে বলা যায়— দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা মানেই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
লেখক : গীতিকবি ও রাজনীতি বিশ্লেষক
এফআর