আগের মতো দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা সরকার বাড়াবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। একই সঙ্গে অতীতের সরকারগুলো রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ও এর আকার অতিরঞ্জিত বা ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ দেখাত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার (২৯ মার্চ) রাজস্ব আহরণ বিষয়ক টাস্কফোর্সের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সামাজিক সুরক্ষার অর্থায়ন স্থানীয় রাজস্ব আয়ের মাধ্যমেই সংস্থান করা হবে। সেজন্য যেকোনো অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে। তবে রাজস্বের হার না বাড়িয়েই আয় বাড়াতে তিনটি টাস্কফোর্স দিনরাত কাজ করছে।
তিনি বলেন, আমরা কর ফাঁকি বা জালিয়াতি রোধ করব। কর ছাড়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসব। আগে গোষ্ঠীতান্ত্রিক কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আর কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে অপচয় কমানো হবে।
এই উপদেষ্টা বলেন, অতীতের সরকারগুলো যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বা মোট জিডিপির পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে, সেটার সংস্কার আমরা ইতিমধ্যেই শুরু করেছি। জিডিপির প্রকৃত আকার যখন আমরা পাব, তখন করের সঙ্গে এর আনুপাতিক হারটিও বাস্তবসম্মত হবে। এ ছাড়া অর্থনীতির প্রতিটি খাতে তথ্যের যে কারচুপি করা হয়েছে, তা শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির মাধ্যমে ইতিমধ্যে সামনে এসেছে।
অর্থনীতির সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু লুটপাটই নয়, খাতা-কলমেও ব্যাপক গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আগের ‘পতিত সরকার’ সর্বদা রাজস্ব আয়কে বাড়িয়ে দেখাত, যার সঙ্গে প্রকৃত আহরণের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি’ পেয়েছেন উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত এখন বিশ্বের অন্যতম তলানিতে, যা ৭ শতাংশেরও কম। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিম এশিয়া ও ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাতময় পরিস্থিতিকে তিনি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তবে এই সংকট থেকে সমাধানের পথ খোঁজার ওপর তিনি জোর দেন।
চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে আমরা যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করব বলে আশা করছি। গত বছরের অর্জিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এবার বেশি আদায় সম্ভব হবে। সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কর জিডিপি হারকে ইশতেহার অনুযায়ী প্রথমে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে এই আমলে কর জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এত কম কর আদায় নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, কোনো দেশই চলতে পারে না। তাই বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার গোঁজামিল দিয়ে রাজস্ব আয় দেখাত। আইবাস প্লাস প্লাস সিস্টেমে যাচাই করলে এ অসংগতি স্পষ্ট হবে। তার ভাষায়, একদিকে লুটপাট ও গোষ্ঠীতন্ত্রের মাধ্যমে কর জিডিপি হার তলানিতে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে আয় দেখানো হয়েছে যা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। এখন আইবাসের নতুন সংস্করণের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে (রিয়েলটাইম) তথ্য পাওয়া যাবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ইমাম-মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবায়েত ও বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতাদের জন্যও সহায়তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কৌশল তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে, আর তাতে করের পরিমাণও বাড়বে করহার না বাড়িয়েই। তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ ঋণ কমানো এবং সামগ্রিক সম্পদ বৃদ্ধি— এই তিনটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের তিনটি প্রধান খাত— ভ্যাট, শুল্ক ও আয়করে আগামী তিন মাসে (চতুর্থ প্রান্তিকে) অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজস্ব আদায় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি গত বছরের তুলনায় বেশি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেরও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া এনবিআরকে দুই ভাগ করার সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক আখ্যা দিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করে সামনে এগোনো হবে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অন্তর্বর্তী সরকারের আগে একের পর এক তেল-গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও জনগণের সরকার মূল্যস্ফীতির চিন্তা করে এমনটা করবে না বলেও জানান তিনি। আগারগাঁওয়ের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
এফআর