আকাশের পানে ডালপালা মেলে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে এক শতবর্ষী অশ্বত্থগাছ। রুক্ষ মাটির বুক চিরে উঠে আসা এই গাছটি যেন এই জনপদের বিবর্তনের নীরব সাক্ষী। গাছের ওপরের অংশ যখন রোদে ঝলমল করছে, ঠিক তখনই তার বিশাল ছায়ার নিচে শান্ত হয়ে আছে এক টুকরো জগৎ। সেই সুশীতল ছায়াতেই জমে উঠেছে এক অস্থায়ী বাজার।
রোদ থেকে বাঁচতে ব্যবসায়ীরা কেউ টাঙিয়েছেন পুরোনো কাপড়ের শামিয়ানা, কেউবা নীল-সাদা পলিথিনের ছাউনি। সেই ছাউনিগুলোর নিচেই শাকসবজি, ফলমূলসহ নানা পণ্যের পসরা নিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসেছেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। এসব ভাসমান দোকানে ত্রেতাদেরও উপচেপড়া ভিড়। এটি শত বছরের বিল্বগ্রাম হাট। এর অবস্থান বরিশালের গৌরনদী উপজেলায়। হাটটি বসে সপ্তাহের দুই দিন শনি ও বুধবার।
বিল্বগ্রাম হাট শুধু গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্মারক নয়, এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতির ছবিটাও চোখে পড়ার মতো। বাজারের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে একটি মসজিদ ও একটি কালীমন্দির। উপাসনালয় দুটি যেন মানুষের সহাবস্থানের বার্তা দিচ্ছে।
সম্প্রতি এই হাটে গিয়ে দেখা গেল মানুষের নানা কর্মকাণ্ড। বিল্বগ্রাম হাটে রয়েছে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও। শতবর্ষী এই হাটে মূলত অস্থায়ী দোকান বসলেও কিছু স্থায়ী দোকানও রয়েছে।
তেমন একটি এক তলা ভবন (মার্কেট) রয়েছে নারীদের জন্য। সেখানে তারা কসমেটিকস, তৈরি পোশাক, হোমিও চিকিৎসালয় ও বিউটি পার্লার চালায়। ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) অর্থায়নে নারীদের স্বাবলম্বী করতে এই ভবন নির্মাণ করা হয়। গ্রামীণ হাটের ভেতর এমন নারী উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। এই স্থায়ী দোকানগুলো অবশ্য প্রতিদিনই খোলা থাকে।
ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী এই হাটের বিষয়ে বিল্বগ্রামের বাসিন্দা মো. শাহজাহান মিয়া সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকে এই হাট দেখছি। আমার বাবা-দাদার মুখেও এই হাটের বর্ণনা শুনেছি। গৌরনদী এলাকার সবচেয়ে পুরোনো হাটবাজারের মধ্যে এটি অন্যতম।’
হাটটি এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে উল্লেখ করে শাহজাহান মিয়া বললেন, বিশেষ করে চাষের মাছ এবং পান— এ দুটি পণ্য এখানে বিখ্যাত। এখান থেকে মাছ, পান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশের গৌরনদী উপজেলার অশোককাঠি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার আঁকাবাঁকা সরু পিচঢালা সড়ক ধরে গেলেই বিল্বগ্রাম হাট। চারপাশে খাল-বিল আর সবুজ ধানখেত পেরিয়ে হঠাৎ করেই চোখে পড়ে হাটটি। ঢুকতেই দেখা যায়, একটি বড় খোলা মাঠ। এখানে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠানও হয় মাঝে মধ্যে।
প্রথম গলি ধরে এগোতেই চোখে পড়ে নারীদের এক তলা মার্কেটটি। এখানে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের সেবা দেন রেখা রানী দাস। পাশের আরেকটি কক্ষে মিনু বেগম নামের আরেকজনের প্রসাধনীর দোকান রয়েছে।
রেখা রানী দাস বললেন, ‘২০১৭ সালে সরকার আমাদের এই মার্কেট করে এর কক্ষ বরাদ্দ দিয়েছে। ওই সময় আমাদের কিছু পুঁজিও দেওয়া হয়েছিল। এখন মাসে ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে আমরা এই মার্কেটে ব্যবসা করে পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে আছি।’
এই মার্কেটের দক্ষিণ পাশে সামুদ্রিক ও স্থানীয় বিল ও ঘেরে চাষ করা মাছ বিক্রির জন্য রয়েছে দুটি বড় ছাউনি (শেড)। সেখানে তাজা মাছ নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। ক্রেতারা দরদাম করছেন, কিনছেন। রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাঙাশ, তেলাপিয়া, শোল, কই, শিং, মাগুরসহ হরেক রকমে দেশি-বিদেশি মাছ।
আরও একটু সামনে এগোলেই চোখে পড়ে বিশাল অশ্বত্থগাছটি। এর নিচের খোলা মাঠজুড়ে শাকসবজি আর ফলের পসরা নিয়ে বসেছেন অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা। লাউ, কুমড়া, শিম, বেগুন, মরিচ, শাকের আঁটি- সবই স্থানীয় খেত আর বাড়ির আঙিনার ফসল। এখানকার বেশির ভাগ বিক্রেতাই নিজের উৎপাদিত পণ্য এনে বিক্রি করেন।
বেলাল হোসেন নামের ভাসমান এক সবজি বিক্রেতা বললেন, ‘শনি ও বুধবার আমাদের ভাসমান হাট বসে। আমরা এখানে স্থানীয় শাকসবজি বিক্রি করি। এটা এই অঞ্চলের পুরোনো বড় বাজার। বেচাবিক্রিও খুব ভালো। তাই অনেক ব্যবসায়ী এখানে আসেন নিয়মিত। ক্রেতাদেরও প্রচুর ভিড় থাকে।’
অশ্বত্থগাছের তলায় শত বছরের এই হাট যেন মানুষের জীবন-জীবিকার গল্পের সাক্ষী হয়ে থাকে। সময় বদলায়, কিন্তু হাটটি তার চিরচেনা ছন্দে টিকে থাকে।
এফআর