বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর প্রথম আট মাসে আশানুরূপ সাড়া পায়নি ইলন মাস্কের স্টারলিংক। স্থানীয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি দাম হওয়ায় এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার প্রতি গ্রাহকরা তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্পেসএক্স পরিচালিত এই সেবার গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩,৪৬৯ জন।
২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল স্টারলিংক বাংলাদেশে পরিচালনার লাইসেন্স পায় এবং ২০ মে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। শুরুতে তারা ৬,০০০ টাকা এবং ৪,২০০ টাকা মাসিক মূল্যের দুটি আবাসিক প্যাকেজ চালু করেছিল।
এই হার স্থানীয় ব্রডব্যান্ড সেবার তুলনায় অন্তত ১০ গুণ বেশি। বাংলাদেশে বর্তমানে ৫ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট গড়ে ৪০০ টাকায় এবং ৪০ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি ১,২০০ টাকায় পাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ কোটিরও বেশি ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে, যার মধ্যে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারী ১.৪৫ কোটি।
এদিকে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্টারলিংকের প্রসারের গতি বেশ ধীর। উদাহরণস্বরূপ, কেনিয়ায় (যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৩ কোটির কম) ২০২৩ সালের জুলাইয়ে চালুর আট মাসের মধ্যে স্টারলিংক ৪,৮০৮ জন গ্রাহক সংগ্রহ করেছিল। অন্যদিকে, নাইজেরিয়ায় (১৫ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী) ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চালুর ১১ মাসের মধ্যে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২৩,৮৯৭ জনে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ঘনবসতি, সাশ্রয়ী মূল্যের ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে স্টারলিংকের আবেদন সীমিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং জেনারেল ম্যানেজার শাহ আহমদুল কবির বলেন, সাধারণ ব্যবহারকারীরা মূলত ফাইবার কাভারেজ আছে এমন এলাকায় থাকেন। তাই আমরা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল, মাছ ধরার নৌকা এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রেনের মতো বিশেষ ক্ষেত্রগুলোর দিকে নজর দিচ্ছি।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি স্টারলিংক টার্মিনাল বিক্রি করেছে এবং তিনটি পাহাড়ি জেলার ১২টি স্কুলে সংযোগ দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ১৫০টি স্কুলে এই সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ফেলিসিটি আইডিসি-র প্রধান নির্বাহী শরফুল আলম জানান, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো স্টারলিংককে মূল ইন্টারনেট সংযোগ হিসেবে না দেখে ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, দামের বিশাল পার্থক্যের কারণে মানুষ বিদ্যমান ব্রডব্যান্ড সেবা ছেড়ে স্টারলিংকে আসবে, এমন সম্ভাবনা কম।
ফেলিসিটি আইডিসি-র স্টারলিংক প্যাকেজগুলোর দাম ২৫,০০০ টাকা থেকে ৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত (১ টেরাবাইট থেকে ৪ টেরাবাইট ডেটা)।
স্টারলিংক ইতিমধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাই-টেক সিটিতে অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, যার গেটওয়ে পরিচালনা করছে ফেলিসিটি আইডিসি। এ ছাড়া রাজশাহী ও যশোরেও তাদের গেটওয়ে রয়েছে। সামিট কমিউনিকেশনস ফাইবার লিংকের মাধ্যমে এই সাইটগুলোকে সংযুক্ত করেছে।
এদিকে, স্টারলিংক প্রতিবেশী দেশগুলোতে আনফিল্টারড ব্যান্ডউইথ রফতানির প্রস্তাব দিয়েছে। বিটিআরসি এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে এবং সরকারের অনুমোদনের পরিকল্পনা করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি শর্ত দিয়েছে যে, বিদেশি ট্রাফিক যেন দেশীয় ব্যবহারকারীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক ডেটা হাবে পরিণত হতে পারে এবং দেশীয় অপারেটরদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ প্রশস্ত হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং কঠোর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে বিটিআরসি।
সময়ের আলো/জেডআই