ইরান-আমেরিকা সংঘাতের ভয়াবহতায় এবার সামনে এলো এক নতুন ও উদ্বেগজনক অধ্যায়। দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুল ও স্পোর্টস হলে যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষামূলক ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ (প্রিজম) ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। এই হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ভলিবল অনুশীলনে থাকা একদল কিশোরীও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসা এই তথ্য নতুন করে যুদ্ধের নৈতিকতা, কৌশল এবং বেসামরিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে কয়েক দিন আগের আরেকটি মর্মান্তিক হামলার স্মৃতিও ফিরে এসেছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাব এলাকায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় বহু শিক্ষার্থী নিহত ও আহত হয়েছিল। সেই ঘটনার পর ইরানের পরিবারগুলো জাতিসংঘের কাছে বিচার চেয়েছে, আর জাতিসংঘও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। নতুন এই প্রিজম হামলা সেই ক্ষতকে আরও গভীর করেছে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে।
রহস্যময় ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্রিজম’: ‘প্রিজম’ বা প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল হলো মার্কিন সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক সারফেস-টু-সারফেস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
২০১৯ সালে আইএনএফ চুক্তি বাতিলের পরপরই এটি প্রকাশ্যে আসে। এই চুক্তির অধীনে স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। পেন্টাগন এখনও এর পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য দেয়নি।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি পুরোনো এটিএসিএএমএস ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত সংস্করণ। যেখানে পূর্বের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, সেখানে প্রিজম ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে নির্ভুল আঘাত হানতে পারে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দক্ষিণ ইরানের জনবহুল এলাকায় এই হামলা চালানো হয়। একটি স্পোর্টস হলে কিশোরীরা ভলিবল অনুশীলন করছিল ঠিক সেই সময়ই বিস্ফোরণ ঘটে।
ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এটি প্রিজম ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে মিলে যায়। স্কুল ও খেলাধুলার স্থানে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘনের শামিল।
এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে লকহিড মার্টিন, যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের একটি কারখানায়। গত বছরের ডিসেম্বরেই প্রথম ব্যাচ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পেন্টাগন এর উৎপাদন চারগুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এ জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। হাইমার্স ও এম ২৭০ রকেট সিস্টেম থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব, যা যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার আরও সহজ করেছে।
পেন্টাগনের ধারণা, প্রিজম ভবিষ্যতের যুদ্ধ কৌশলে বড় পরিবর্তন আনবে। এটি শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। ভবিষ্যতে এর এমন সংস্করণ আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা চলন্ত জাহাজেও আঘাত হানতে পারবে।
স্কুল ও বেসামরিক স্থাপনায় পরীক্ষামূলক অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমর বিশেষজ্ঞরা একে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অনৈতিক’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ইরান ইতিমধ্যে এই হামলার প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলা শুধু প্রাণহানি নয়, বরং পুরো অঞ্চলে প্রতিশোধের চক্রকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। ইতিমধ্যেই চলমান যুদ্ধকে এটি আরও বিস্তৃত ও অনিশ্চিত করে তুলছে।