মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে ভারতীয় অর্থনীতি ক্রমেই চাপে পড়ছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ভারতীয় রুপির মান দ্রুত কমে যাচ্ছে, যা দেশটিকে সম্ভাব্য মুদ্রা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
অর্থনীতিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স ছিল ভারতীয় রুপির। ওই বছর মুদ্রাটির মান প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়। চলতি বছরেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রুপির মান আরও প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে স্থিতিশীল থাকায় ভারতের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। এতে দেশটির চলতি হিসাবের ঘাটতি (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট) আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ প্রিয়াঙ্কা কিশোর বলেন, ভারত ইতোমধ্যেই উচ্চ ঘাটতিযুক্ত অর্থনীতির ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রুপির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণেও একই ধরনের আশঙ্কা উঠে এসেছে।
ওয়েলস ফার্গো এবং ভ্যান এক অ্যাসোসিয়েটসের বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ডলারের বিপরীতে রুপির মান ১০০ এর কাছাকাছি নেমে যেতে পারে।
এদিকে, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে প্রতি ডলারে ১০০ রুপির স্তর বাস্তবে পরিণত হতে পারে।
গবেষক আহমেদ আইজান বলেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো মূলত স্বল্পমেয়াদি এবং কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে পারছে না।
রুপির দরপতন ঠেকাতে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তাতে খুব একটা সফলতা আসেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করছে।
২০২৫ সালে তারা প্রায় ৫১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বলে জানা গেছে।
তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ভারতের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
দেশটির শীর্ষ ব্যাংকগুলোর শেয়ারদর কমে যাওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষক সিদ্ধার্থ রাজপুরোহিত বলেন, তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের আশেপাশে থাকে, তবে রুপির ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে এবং তা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে দেশটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানিয়েছেন, রুপির দরপতনে রপ্তানিতে কিছুটা সুবিধা হলেও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রভাব নেতিবাচক।
তবে তিনি দাবি করেন, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনও প্রায় ১১ মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে কেবল যুদ্ধই দায়ী নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং উৎপাদন খাতের সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে তারা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ভারতের অর্থনীতি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো হয়ে উঠছে।
সময়ের আলো/আরবিএন