ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধের মূল্যায়ন ইতিমধ্যেই মূলধারার গণমাধ্যম, জনমত এবং বিশ্লেষকদের বড় অংশে প্রায় নির্ধারিত হয়ে গেছে। যারা এখনও এই যুদ্ধ সমর্থন করছে, তারা মূলত দুটি পূর্বানুমেয় গোষ্ঠী- সরকারি বক্তব্য এবং প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে অনুগত সমর্থকরা, সঙ্গে ইসরাইলপন্থি ঘরানার কিছু শক্ত অবস্থান। এই গণ্ডির বাইরে, যুদ্ধটিকে ব্যাপকভাবে বেপরোয়া, অযৌক্তিক এবং কৌশলগতভাবে অসংগত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিস্তৃত আমেরিকান জনগণের মধ্যে এই ধারণা কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এটি তৈরি হয়েছে বাড়তে থাকা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক চাপ এবং এই অনুভূতি থেকে যে যুদ্ধটির কোনো স্পষ্ট উদ্দেশ্য বা দিকনির্দেশনা নেই।
ইরানে পরাজয় কেবল একটি নীতিগত ব্যর্থতা হবে না; এটি সেই পরিচয়ের ভাঙন ডেকে আনবে, যার ওপর ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলেছেন। একজন নেতার জন্য, যিনি আত্মরতিতে পরিচালিত; এমন ভাঙন অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করতে পারে। এই সংকট শুধু তার রাজনৈতিক অবস্থান নয়, তার সমর্থকদের সঙ্গেও সম্পর্ককে নড়বড়ে করে দিতে পারে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জনমত জরিপগুলো ধারাবাহিকভাবে একদিকেই ইঙ্গিত করছে। মার্চের শেষ দিকে পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের এই সংঘাত মোকাবিলার পদ্ধতি সমর্থন করেন না। আরেকটি এপি-নরক জরিপে দেখা গেছে, ১০ জনের মধ্যে ৬ জন মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই ‘মাত্রা ছাড়িয়েছে’।
এমনকি ফক্স নিউজের জরিপেও ৫৮ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। এই পরিসংখ্যানগুলো একটি বড় প্রবণতাকে নিশ্চিত করে, যা যুদ্ধের শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে এবং ক্রমেই তীব্র হয়েছে। রয়টার্স ১৯ মার্চ জানিয়েছে, মাত্র ৭ শতাংশ আমেরিকান পূর্ণমাত্রার স্থল আক্রমণ সমর্থন করেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন ট্রাম্প সম্ভবত এমন আক্রমণের দিকেই এগোবেন। এতে নীতিনির্ধারণ ও জনমতের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কয়েকদিন পর রয়টার্স জানায়, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নেমে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, এর প্রভাব ততই সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি অনুভূত হচ্ছে। দূরের সংঘাত ধীরে ধীরে দৈনন্দিন অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হচ্ছে। আমেরিকার বুদ্ধিজীবী মহলেও এখন বিরোধিতা শুধু ঐতিহ্যগত যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক ঘরানার মধ্যেও।
২০২৬ সালের কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্স থেকে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, অনেক সমর্থক সতর্ক করেছেন যে এই যুদ্ধ আরেকটি ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ পরিণত হতে পারে। এই মিলিত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সাময়িক মতবিরোধ নয় বরং জনমতের গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবুও সিএনএন থেকে ফক্স নিউজ পর্যন্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অনেকাংশেই এড়িয়ে গেছে সেই বিষয়টি, যা অনেক আমেরিকান ইতিমধ্যেই বুঝতে পারছেন- এই যুদ্ধ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ওয়াশিংটনের ভেতরেও অস্বস্তি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্চে জানিয়েছে, দুই দলের আইনপ্রণেতারাই প্রশাসনের কৌশল নিয়ে ক্রমেই সন্দিহান হয়ে উঠছেন। কৌশলগত দিক থেকে, যুদ্ধের ভিত্তিগত ধারণাগুলো ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ইসরাইলের প্রাথমিক ধারণা ছিল, উত্তেজনা বাড়ালে ইরানের ভেতরে ভাঙন তৈরি হবে; কিন্তু তা বাস্তব হয়নি।
ইরানের রাজনৈতিকব্যবস্থা অটুট রয়েছে, নেতৃত্ব স্থিতিশীল এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অধীনে সামরিক ঐক্যও অটুট আছে। একই সময়ে তেহরান একাধিক ফ্রন্টে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে, ইসরাইলি ভূখণ্ড এবং অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করে যাচ্ছে, যা ধারাবাহিক হামলার মধ্যেও তাদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করছে। বাস্তবতা হলো, ইরানে সরকার পরিবর্তন আনতে হলে বিশাল স্থল আক্রমণ, বিস্তৃত জোট এবং দীর্ঘমেয়াদি দখল প্রয়োজন হবে। তবুও এমন পরিস্থিতিতেও সাফল্য নিশ্চিত নয়; ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেয়।
এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে- যখন যুদ্ধের কৌশলগত ভিত্তিই ভেঙে পড়ছে, তখন এটি চালিয়ে যাওয়ার কারণ কী? এর একটি অংশ কৌশলে নয়, মনস্তত্ত্বে নিহিত। ২০২৬ সালের বিভিন্ন বিশ্লেষণে উদ্ধৃত রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের গবেষণায় বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নেতৃত্বের ধরন গভীরভাবে আত্মরতিতে মগ্ন। অতিরঞ্জন, সমালোচনায় অতিসংবেদনশীলতা এবং প্রাধান্য দেখানোর প্রবল চাহিদা- এসব বৈশিষ্ট্য তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ট্রাম্পের বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই অপমান, আধিপত্য এবং প্রদর্শনের ওপর নির্ভর করে এসেছে, যেখানে রাজনীতিকে আলোচনা নয়, শক্তির প্রতিযোগিতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই কাঠামোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ানো এক ধরনের মানসিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। পিছু হটা দুর্বলতা হিসেবে দেখা যেতে পারে, আর আপস মানে অপমান। যে নেতার পরিচয় শক্তির প্রদর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে, তার জন্য এসব ফলাফল রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত প্রবণতা প্রশাসনের সামগ্রিক সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা বারবার ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ বা ‘নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ মতো ভাষা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই ভাষার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুসংহত কৌশলের মিল পাওয়া যায়নি, যা প্রদর্শন ও পরিকল্পনার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট করে।
একই সময়ে, শক্তি ও আধিপত্যের ওপর অতিরিক্ত জোর প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরান কোনো ভেঙে পড়ার অপেক্ষায় থাকা রাষ্ট্র নয় বরং এটি একটি আঞ্চলিক শক্তি, যার রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং কৌশলগত স্থিতিস্থাপকতা। তবুও ট্রাম্প এমন ধারণা নিয়ে এগিয়েছেন যে, মার্কিন শক্তিই সবকিছু নির্ধারণ করবে; যা অতীতের সামরিক শক্তি প্রদর্শন থেকে তৈরি এক ভ্রান্ত ধারণা।
রয়টার্স মার্চের শেষ দিকে জানিয়েছে, এখন ট্রাম্পের ওপর দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়ছে, কারণ প্রশাসন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পষ্ট কোনো প্রস্থান কৌশল নেই, ফলে প্রশাসন উত্তেজনা বাড়ানো এবং রাজনৈতিক ক্ষতির মধ্যে আটকে পড়েছে। এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘সহজ কোনো সমাধান নেই’, যা এই কৌশলগত সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। আরেকজন জানান, যেকোনো ধরনের প্রত্যাহার এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তা পরাজয় মনে না হয়। যা দেখায়, ফলাফলের পাশাপাশি চিত্র নিয়েও প্রশাসন সমানভাবে চিন্তিত।
এখানেই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ট্রাম্প তার রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন শক্তি, আধিপত্য এবং বিজয়ের ধারণার ওপর। ইরানে পরাজয় শুধু নীতিগত ব্যর্থতা নয়; এটি সেই পরিচয়ের ভাঙন ঘটাবে। আত্মরতিতে পরিচালিত একজন নেতার জন্য এটি অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করতে পারে, যা তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ককে হুমকির মুখে ফেলবে। এ কারণেই কিছু বিশ্লেষক এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের লোকজন একটি নাটকীয় প্রস্থান কৌশলের কথা বলতে শুরু করেছেন।
রয়টার্স ১৪ মার্চ জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা ডেভিড স্যাক্স সরাসরি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ‘বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা’, যদিও কোনো স্পষ্ট কৌশলগত ফল অর্জিত হয়নি। এ ধরনের পদক্ষেপ ট্রাম্পকে সাফল্যের দাবি করতে দেবে, একই সঙ্গে একটি ক্রমশ অচল হয়ে পড়া সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করবে; যেখানে শক্তির ভাবমূর্তি অক্ষণ্ন রাখা যাবে। কিন্তু এখানেই এই যুদ্ধের গভীর সত্যটি স্পষ্ট হয়। এখানে যে ‘বিজয়’ খোঁজা হচ্ছে, তা সামরিক নয়, এটি মানসিক। এই কারণে ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুধু নৈতিক বা আইনি সংকট নয়; এটি এক ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়, যার পেছনে বড় অংশে কাজ করছে এমন এক নেতৃত্বের মনস্তত্ত্ব, যা নিজের ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি স্বীকার করতে অনিচ্ছুক।
সময়ের আলো/আআ