ইরানের একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় চলতি বছর ব্যাপকভাবে নির্মাণকাজ বেড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)। ছয় বছরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটির গবেষকেরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত ওই স্থাপনাটি ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের কাছে অবস্থিত। রাজধানী তেহরান থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৪০ মাইল। শক্ত গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে স্থাপনাটি তৈরি করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে পিক্যাক্স মাউন্টেনের নির্মাণকাজে স্পষ্ট গতি বেড়েছে। তাদের ধারণা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিরাপদে রাখার জন্য স্থাপনাটি তৈরি করা হতে পারে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের ধারণা, ভবিষ্যতে ইরান সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে নিতে পারে। তবে স্থাপনাটি বর্তমানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিক্যাক্স মাউন্টেনে হামলার হুমকি দিয়েছেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই সেখানে হামলা চালাতে পারে।
তবে স্থাপনাটি পাহাড়ের গভীরে এবং শক্ত গ্রানাইটের মধ্যে থাকায় সেখানে হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও কঠিন হতে পারে। সিএসআইএসের বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা দিয়েও স্থাপনাটি পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কাজ করছে বলে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি সংস্থা নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে একটি বিশেষ ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাকেন্দ্র মেরামতের জন্য ১২ লাখ ডলারের জরুরি চুক্তি করে। সেখানে গভীর ভূগর্ভে থাকা লক্ষ্যবস্তুর ওপর অস্ত্রের প্রভাব পরীক্ষা করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ওই পরীক্ষাকেন্দ্রে মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হয়। মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেখানে নির্মাণকাজ চলতে দেখা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো অস্ত্র পরীক্ষা হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি সিএনএন।
এর আগে, ২০২৫ সালের জুনে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলায় ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গভীর ভূগর্ভে থাকা ইসফাহানের একটি স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আরও শক্তিশালী একটি ‘নেক্সট জেনারেশন পেনিট্রেটর’ বোমা তৈরির কাজ করছে। নতুন এই অস্ত্র আরও গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, সিএসআইএসের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাঘাই মাউন্টেনে এখন শুধু সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ নয়, স্থাপনার ভেতরের নির্মাণ ও বাইরের নিরাপত্তা জোরদারের কাজও চলছে। সেখানে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ শক্ত করা, অভ্যন্তরীণ রাস্তা পাকা করা এবং প্রবেশপথের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর মতো কাজ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কার্যক্রম থেকে ধারণা করা যায়, স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। তবে নির্মাণকাজ এখনো চলমান থাকায় এটি বর্তমানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত কি না, তা নিশ্চিত নয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের এই গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা এবং নতুন অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ আগামী দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ