কেন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ চাইছে নেপাল, নেপথ্যে কী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপালের দায় খুবই কম, কিন্তু এদিকে ভয়াবহ ফল ভোগ করতে হচ্ছে তাদেরই। সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে

2026-09-09T17:34:43+00:00
2026-09-09T17:34:43+00:00
 
  বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
কেন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ চাইছে নেপাল, নেপথ্যে কী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৩৪ পিএম 
ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের বাইরের দেয়ালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি দেখছেন স্বজনেরা। ছবি : আল-জাজিরা
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপালের দায় খুবই কম, কিন্তু এদিকে ভয়াবহ ফল ভোগ করতে হচ্ছে তাদেরই। সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে হাজারো মানুষ মারা যাওয়া ও নিখোঁজ হওয়ার পর দেশটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’এবং ২ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। 

গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস হয়। একটি পাহাড়ি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ পানি ও কাদা নিচের দিকে নেমে আসে। এতে নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোটসহ বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনায় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ।  

Advertisement
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, যে বৈশ্বিক সংকট নেপাল সৃষ্টি করেনি, তার সবচেয়ে বড় মূল্য এখন নেপালের মানুষকেই দিতে হচ্ছে। তাই নেপালের জন্য সহায়তাকে শুধু দান বা সাহায্য হিসেবে দেখা উচিত নয়, এটিকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একই আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নেপালের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর কথা শুধু শুনলেই হবে না, তাদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হবে।

কেন ক্ষতিপূরণ চাইছে নেপাল?

নেপাল বিশ্বের মোট ০.১ শতাংশেরও কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে। দেশটির বিদ্যুতের বড় অংশও আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নেপাল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটি হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহও দ্রুত গলে যাচ্ছে।    

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের হিমবাহগুলো গত প্রায় ৩০ বছরে তাদের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। 

শুধু নেপাল নয়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান— এই দেশগুলো নিয়ে গঠিত হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলোও দ্রুত গলে যাচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহ আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি দ্রুত বরফ হারিয়েছে।

অর্থাৎ, যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম কার্বন নিঃসরণ করে, তারাও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে।

নেপালের মানুষের ক্ষোভ কোথায়?

নেপালের জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, বিশ্বের মানুষ সাধারণ সময়ে নেপালের জলবায়ু সংকট নিয়ে খুব বেশি কথা বলে না। বড় কোনো দুর্যোগ হলে তখন সবার নজর পড়ে। 

নেপালের জলবায়ু কর্মী তনুজা পান্ডে বলেন, হাজার হাজার মানুষ মারা যাওয়ার পর যখন সারা বিশ্বের নজর নেপালের দিকে যায়, তখন মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়। তাদের প্রশ্ন— জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এত বড় দুর্যোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে কেন?

আরেক জলবায়ু কর্মী শ্রেয়া কেসি বলেন, তার বাড়ি পূর্ব নেপালের সোলুখুম্বু জেলায়। এই অঞ্চল পাহাড়ি এবং এভারেস্টও এই এলাকায় অবস্থিত। হিমবাহ গলে যাওয়ার ঘটনা দেখে সেখানকার মানুষ বুঝতে পারছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা নেপালের যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে।

তিনি বলেন, নেপালের মানুষ নিজেরাও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কাজ করছেন। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, বন সংরক্ষণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে তারা কাজ করছেন। কিন্তু অন্য দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে যদি নেপালের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তারা ন্যায়বিচার চাইতেই পারেন। 

নেপালের ক্ষয়ক্ষতি কেমন? 

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ভূমিধস ও বন্যায় দেশটির বাড়িঘর, রাস্তা, অবকাঠামো ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৫৬ কোটি ডলার।  

এই বিশাল ক্ষতির কারণে নেপাল জাতিসংঘের কাছে ২ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছে।

জাতিসংঘ ২০২২ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ বা ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলার তহবিল গঠন করেছিল। এর উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়া দেশগুলোকে সহায়তা করা।  

তবে এই তহবিলেও বর্তমানে প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের ঘাটতি রয়েছে। 

‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ বলতে কী বোঝায়? 

সহজভাবে বললে, যে দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য খুব কম দায়ী, কিন্তু এর কারণে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে— সেই দেশগুলোর প্রতি ন্যায্য আচরণ করাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল কথা। 

পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক অধ্যাপক জয়িতা গুপ্তার মতে, নেপাল খুব কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে। তাই নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচার দাবি করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। 

তবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া বাস্তবে খুব সহজ হবে না। 

কারণ আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি থাকলেও পরে বিষয়টি অনেকটাই ‘সহায়তা’ দেওয়ার দিকে চলে যায়। 

২০২৫ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেয়। আদালত বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সব দেশেরই জলবায়ুর বড় ধরনের ক্ষতি ঠেকানোর দায়িত্ব রয়েছে। 

কোনো দেশ তার আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংক্রান্ত দায়িত্ব ভঙ্গ করলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। 

তবে এই মতামত সরাসরি বাধ্যতামূলক আইন নয়। তারপরও এটি নেপালের মতো দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ দাবিকে আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে কিছুটা শক্তিশালী করতে পারে।


শুধু বাইরের দেশকে দায়ী করলেই হবে না 

নেপালের জলবায়ু কর্মীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অর্থ চাওয়ার পাশাপাশি দেশের ভেতরের সমস্যাগুলোর সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তনুজা পান্ডে বলেন, শুধু অন্য দেশকে দায়ী করলেই হবে না। নেপালের নিজের উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও জলবায়ু ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তার মতে, দেশের ভেতরে ন্যায়বিচার ছাড়া জলবায়ু ন্যায়বিচারও সম্ভব নয়। 

উন্নয়ন প্রকল্প, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো তৈরির সময় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বলে জলবায়ু নিরাপত্তাকে কোনো অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। 

তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ না করে নেপালে বিনিয়োগ করা শেষ পর্যন্ত ভালো বিনিয়োগ হবে না।

সামনে আরও বড় বিপদ হতে পারে

নেপালের বর্তমান সংকট শুধু একটি বন্যা বা পাহাড়ধসের ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

হিমবাহ গলতে থাকবে, বর্ষার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে পারে। ফলে নেপালের মতো দেশ ছাড়াও বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। 

বিশেষ করে ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এ কারণেই ধনী দেশগুলো বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। কারণ একবার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়ম তৈরি হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশ একই দাবি করবে।  

তবে নেপালের মতো দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে— জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে হলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশকে টাকা দিলেই হবে না, বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে দ্রুত কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা রয়েছে এবং ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসতে পারে।

সুতরাং, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা বেশি দায়ী, তাদের আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। আর যারা কম দায়ী হয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দান হিসেবে নয় বরং ন্যায্য অধিকার হিসেবে  তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।  


সূত্র : আল-জাজিরা 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ 

  বিষয়:   নেপাল  জলবায়ু পরিবর্তন  ক্ষতিপূরণ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: