মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বুধবারের ভাষণের পর ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আরও ফিকে হয়েছে। ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তার এই ভাষণের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম একলাফে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এদিকে ট্রাম্পের হুমকির কঠোর জবাব দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে বিধ্বংসী জবাব দেওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করেছে তারা।
ইরানের সেনাবাহিনী বলেছে, শত্রুরা পরাজয় মেনে নেওয়ার আগপর্যন্ত যুদ্ধ থামবে না। এই কথার লড়াইয়ের পাশাপাশি ইরানের শতবর্ষী চিকিৎসা গবেষণাকেন্দ্র এবং দুই বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদন কারখানায় মার্কিন-ইসরাইলি হামলার খবর মিলেছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের এক সাইটে হামলা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এদিকে যুদ্ধ বন্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। সংঘাত নিরসনে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। পাকিস্তানও তার কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের হুঁশিয়ারি : ভাষণে ট্রাম্প যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না দিয়ে বরং হামলা আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ আঘাত হানব। আমরা তাদের পাথর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানি নেতারা যদি ওয়াশিংটনের শর্তে রাজি না হন, তবে ইরানের জ্বালানি ও তেল অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হতে পারে। ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে আরও ‘বিধ্বংসী ও ভয়াবহ’ হামলার সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দফতরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, শত্রুদের ‘অনুশোচনা ও আত্মসমর্পণ’ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।
সমাধান এখনও অনিশ্চিত : রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমান ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে তেহরানের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, তারা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায় না এবং কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমেও আলোচনা হচ্ছে না।
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং জানিয়েছেন, ট্রাম্প নির্দিষ্ট কিছু শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পারেন। পাকিস্তান সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিলেও এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সেখানে যোগ দেওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
এ থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনার বিষয়টি নিয়ে এখনও দুই পক্ষের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কোনো পক্ষের বক্তব্যে কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে আর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন পর্যন্ত।
তেলের দাম চড়ছেই : যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার আশায় থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্রাম্পের ভাষণ ছিল ব্যাপক হতাশাজনক, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আগামী ২-৩ সপ্তাহ ইরানে সামরিক অভিযান আরও তীব্রতর হবে, ট্রাম্পের এ ঘোষণায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন এবং তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুরবস্থার ঝুঁকিতে ফেলা সংঘাত কবে বন্ধ হতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণে তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও পাওয়া যায়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস ভাষণে না থাকায় বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ১৬ ডলারে পৌঁছে যায়। বৃহস্পতিবারও এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের পাশাপাশি জাপানসহ এশিয়ার একাধিক শেয়ারবাজারেও লেগেছে জোর ধাক্কা। ‘তিনি যদি শেয়ারবাজারে আস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকেন, তিনি তা পারেননি। সব বিনিয়োগকারীদের মনেই এখন মূল প্রশ্ন, কবে এই যুদ্ধ শেষ হবে? এ কারণেই এই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে’- বলেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগ ও শেয়ার বাজারপ্রধান রাসেল চেসলার।
হরমুজ বন্ধ থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে, নভেম্বরে হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ দামবৃদ্ধি ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের ভরাডুবির কারণ হতে পারে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই আশঙ্কা করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে পুতিন ও সালমানের ফোনালাপ : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। গতকাল এক ফোনালাপে দুই নেতা এই আহ্বান জানান।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘উভয় পক্ষই দ্রুত শত্রুতা বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।’ এই ফোনালাপটি এমন একসময়ে হলো যখন ইরান নির্মিত ড্রোনের হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের সঙ্গে একটি বিমান প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) চুক্তি সই করেছে সৌদি আরব।
বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন। সাংবাদিকদের পেসকভ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (পুতিন) নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। যদি আমাদের সহায়তার কোনো প্রয়োজন পড়ে, তবে বর্তমান সামরিক পরিস্থিতিকে যত দ্রুত সম্ভব শান্তিপূর্ণ ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমরা অবশ্যই সব ধরনের অবদান রাখতে প্রস্তুত।’
মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখবে পাকিস্তান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে এবং দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তান তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে। তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বলেও স্বীকার করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইসলামাবাদে সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এই মন্তব্য করেন। যদিও তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো বাধার কথা উল্লেখ করেননি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপের পথ প্রশস্ত করতে পাকিস্তান বর্তমানে একটি বহুজাতিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ইরানের শতবর্ষী চিকিৎসা গবেষণাকেন্দ্র ও দুই ইস্পাত কারখানায় হামলা : ইরানের অন্যতম প্রধান এবং প্রাচীনতম স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। বৃহস্পতিবার দেশটির এক সরকারি কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে ত্রাণ সংস্থাগুলো এই অঞ্চলের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে হামলার পরিণাম নিয়ে সতর্ক করেছিল।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকেন্দ্রের প্রধান হোসেন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরান’ এই হামলার শিকার হয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানটিকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম ‘শতবর্ষী স্তম্ভ’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হামলা।’ শতবর্ষী এই প্রতিষ্ঠানটি ইরানের প্রথম এবং প্রাচীনতম জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই অঞ্চলে টিকা উদ্ভাবন এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ গবেষণায় এটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিল। এই হামলার বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিএনএনের পক্ষ থেকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের প্রধান দুটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানা অচল হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান দুটি হলো আহভাজ শহরের ‘খুজেস্তান স্টিল কোম্পানি’ এবং কেন্দ্রীয় ইসফাহান প্রদেশের ‘মোবারকেহ স্টিল কোম্পানি’। মোবারকেহ স্টিল কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘তীব্র ও ব্যাপক হামলার কারণে তাদের কারখানার উৎপাদন লাইনগুলো বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’
অন্যদিকে খুজেস্তান স্টিল কোম্পানির অপারেশন বিভাগের উপ-প্রধান মেহরান পাকবিন জানিয়েছেন, হামলার ফলে কারখানার যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ইরানের সংবাদমাধ্যম ‘মিজান অনলাইন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, আগামী অন্তত ছয় মাসের আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিটগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছেন না।
সময়ের আলো/কেএইচও