ইরানে স্থলযুদ্ধ যেন ভূগোলের গোলকধাঁধা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে আলোচনার কেন্দ্রে স্থল অভিযান। এক সময় ইরানে স্থলযুদ্ধ অসম্ভব মনে করা হতো। তবে এখন সেই চিন্তার পরিবর্তন

2026-04-03T09:22:45+00:00
2026-04-03T09:22:45+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরানে স্থলযুদ্ধ যেন ভূগোলের গোলকধাঁধা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:২২ এএম 
যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযানে নেতৃত্ব দিতে পারে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন। ছবি: রয়টার্স
চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে আলোচনার কেন্দ্রে স্থল অভিযান। এক সময় ইরানে স্থলযুদ্ধ অসম্ভব মনে করা হতো। তবে এখন সেই চিন্তার পরিবর্তন হয়েছে। আমেরিকা ইরানে স্থল অভিযানের জোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এখন প্রশ্ন- অভিযান কোথা থেকে শুরু হবে এবং কতদূর এগোনো সম্ভব? এই হিসাবের দোলাচলে আটকে আছে যুদ্ধকৌশল। 

মানচিত্রে তাকালে মনে হতে পারে ইরানকে ঘিরে আছে একাধিক প্রবেশদ্বার— পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর কিংবা পশ্চিম সীমান্ত। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত জটিল। ইরানের ভূগোল যেন এক ধোঁয়াশা তৈরি করে রেখেছে; যেখানে প্রবেশের পথ আছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি পথই শেষ পর্যন্ত বড় বিপদের দিকে নিয়ে যায়। যা সহজ পথ বলে ভ্রম হয়, দিনশেষে তা হতে পারে মরণফাঁদ।

Advertisement
এই জটিলতা সবচেয়ে স্পষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে। খারগ দ্বীপ, হরমুজ প্রণালি, আবু মুসা ও তুনব দ্বীপপুঞ্জ, চাবাহার-কোনারাক করিডর এবং আবাদান-খোররামশাহর–প্রতিটি জায়গাই আলাদা সম্ভাবনা তৈরি করে, আবার প্রতিটিই আলাদা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

খারগ দ্বীপ: এটি ইরানের তেল রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র। দেশের অধিকাংশ তেল এখান দিয়েই বিশ্ববাজারে যায়। আকারে ছোট ও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ লক্ষ্য। কিন্তু এই সহজগম্যতাই বিপজ্জনক। এখানে আঘাত হানার অর্থ শুধু সামরিক হামলা নয়, বরং বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া—যা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও সংঘাতকে মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি: বিশ্বের জ্বালানি রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক। এই সরু জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেলের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। বাইরে থেকে মনে হতে পারে এটি নিয়ন্ত্রণ করলেই কৌশলগত প্রাধান্য মিলবে। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো একক বিন্দু নয়, বরং একটি জটিল প্রতিরক্ষা বলয়। বান্দার আব্বাস ও কেশম দ্বীপ মিলিয়ে এটি এক বিস্তৃত সামরিক পরিসর। ফলে এখানে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা মানেই দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী সংঘর্ষের পথে পা বাড়ানো।

আবু মুসা ও তুনব দ্বীপপুঞ্জ: সামরিকভাবে খুব বড় না হলেও এগুলো রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক। সহজ লক্ষ্য মনে হলেও এই দ্বীপগুলো দখল করা মানেই আঞ্চলিক উত্তেজনাকে চরমভাবে উসকে দেওয়া। এখানে লাভের চেয়ে ঝুঁকির পরিমাণই বেশি।

চাবাহার-কোনারাক করিডর: এই পথটি তুলনামূলক খোলা এবং খুব বেশি সেনা-নিয়ন্ত্রিত নয়। কিন্তু এখানে প্রধান বাধা হলো দূরত্ব। ইরানের মূল শক্তিকেন্দ্র থেকে এই অঞ্চল অনেক দূরে হওয়ায়, এখান দিয়ে প্রবেশ করা মানে এক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত পথ পাড়ি দেওয়া।

আবাদান-খোররামশাহর: পারস্য উপসাগর দিয়ে ইরানের ভেতরে ঢোকার সবচেয়ে সরাসরি পথ হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হয়। তবে এই রুটটিও কণ্টকাকীর্ণ। কুয়েত ও ইরাক সীমান্ত সংলগ্ন এই পথে এগোলে পুরোনো যুদ্ধের ক্ষত জেগে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া বর্তমান ইরাকে সক্রিয় ইরান-ঘনিষ্ঠ শক্তিগুলো এই পথকে আক্রমণকারীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে।


এই প্রতিটি পথ একটি বড় সত্যকে সামনে আনে। এগুলো জয়ের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নয়, বরং ধাপে ধাপে উত্তেজনা বৃদ্ধির সোপান। যেখানে চাপ বেশি, সেখানে ইরানের প্রতিক্রিয়াও হবে তীব্র। অন্যদিকে যেখানে সংঘাত সীমিত, সেখানে অর্জিত সাফল্যও হবে নগণ্য।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু অদৃশ্য সমীকরণ। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা মানেই লোহিত সাগরের ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিতে অস্থিরতা, যেখানে হুথি বিদ্রোহীরা সক্রিয়। ফলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলো একসঙ্গে অচল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

পশ্চিম সীমান্তে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সেখানে বাধা অনেক। গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং তুরস্কের অবস্থান—সব মিলিয়ে এই সমীকরণটি অত্যন্ত অনিশ্চিত। উল্টো বিদেশি শক্তির এমন পদক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদকে আরও উসকে দিয়ে জনগণকে সরকারের পাশে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, ইরান তার ভূগোলকে কেবল প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে ব্যবহার করেনি, বরং সেটিকে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করেছে। পাহাড়, মরুভূমি এবং উপকূলের সংমিশ্রণে এমন এক প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে যা আক্রমণকারীর পথকে প্রতি পদে জটিল করে তোলে।

ফলে ইরানে স্থলযুদ্ধ যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন। দ্রুত সাফল্যের স্বপ্ন খুব সহজেই দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং নিয়ন্ত্রণহীন এক চোরাবালিতে বদলে যেতে পারে। দিনশেষে প্রশ্নটি অপরিবর্তিতই রয়ে যায়—প্রবেশের পথ তো চেনা হলো, কিন্তু ফেরার পথ কোথায়?

সূত্র : ফরেন পলিসি

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   ইরান  স্থলযুদ্ধ  ভূগোল  গোলকধাঁধা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: