সংকটে মুমিনের করণীয়

আরিফ খান সাদ

ইসলাম

পৃথিবীতে বর্তমান সময়টা খুব ভালো যাচ্ছে না। বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে,

2026-04-03T11:32:23+00:00
2026-04-03T11:32:23+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
সংকটে মুমিনের করণীয়
আরিফ খান সাদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৩২ এএম 
সংকটে মুমিনের করণীয়। ছবি : সংগৃহীত
পৃথিবীতে বর্তমান সময়টা খুব ভালো যাচ্ছে না। বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার ধাক্কা কেবল সীমান্তেই থেমে থাকে না, বরং তা মানুষের ঘরসংসার, বাজারব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন সময় ইসলামের শিক্ষা আমাদের কেবল ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের দিকেই আহ্বান করে না, বরং সংযম, মিতব্যয়িতা এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণেরও নির্দেশনা দেয়। তাই এই সংকটকে শুধু ভয় বা উদ্বেগের চোখে না দেখে, বরং আত্মশুদ্ধি ও সচেতন জীবনের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই হতে পারে মুমিনের সঠিক পথ।

আমরা জানি প্রাচীন মিসরে নবী ইউসুফ (আ.) কারারুদ্ধ অবস্থায় সেখানকার বাদশাহ একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলেন। পবিত্র কুরআনে বিস্তারিতভাবে সে বিবরণ স্থান পেয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বাদশাহ বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভি, এদের সাতটি শীর্ণ গাভি খেয়ে যাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শিষ ও অন্যগুলো শুষ্ক’ (সুরা ইউসুফ : ৪৩)। এরপর তিনি এর ব্যাখ্যার জন্য কারারুদ্ধ নবী ইউসুফ (আ.)-এর কাছে গেলেন এবং তাঁর কাছে এর সঠিক ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। ইউসুফ (আ.) আসন্ন মন্দা ও দুর্ভিক্ষের কথা জানালেন। মন্দা ও দুর্ভিক্ষকালে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ধস এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় বলে দিলেন। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখতে ভবিষ্যৎ বাজেট পরিকল্পনার নকশাও করে দিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য, ‘ইউসুফ স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বললেন, তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা কাটবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শিষসমেত রেখে দেবে এবং এরপর আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর; তোমরা এ দিনের জন্য যা রেখেছিলে, তা খেয়ে যাবে, কিন্তু অল্প পরিমাণ ব্যতীত, যা তোমরা তুলে রাখবে। এরপরই আসবে এক বছর, তখন মানুষের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তখন তারা রস নিংড়াবে।’ (সুরা ইউসুফ : ৪৭-৪৯)

আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নবী ইউসুফ (আ.) এখানে চৌদ্দ বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন এবং আসন্ন দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলায় দেশের উৎপাদন ও আয়-ব্যয়ের হিসাব করে দিয়েছেন। ইউসুফ (আ.)-এর আল্লাহপ্রদত্ত এই অভূতপূর্ব পরামর্শে বিমোহিত হয়ে বাদশাহ তাঁকে নিজের একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব করলেন। কুরআনের ভাষ্য, ‘বাদশাহ বলল, তাঁকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাঁকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখব’ (সুরা ইউসুফ : ৫৪)। কিন্তু ইউসুফ (আ.) এ প্রস্তাব শুনে নিজের পক্ষ থেকে একটি আবেদন করলেন। কুরআনের ভাষ্য, ‘ইউসুফ বলল, আমাকে দেশের ধন-ভান্ডারে নিযুক্ত করুন’ (সুরা ইউসুফ : ৫৫)। নবী  ইউসুফ (আ.) কেন অর্থমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন? এর কারণও তিনি বর্ণনা করেছিলেন, ‘আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান’ (সুরা ইউসুফ : ৫৫)। এ থেকে আমরা আয় ও ব্যয়ে ভারসাম্য স্থাপনের শিক্ষা পাই। চাই সেটা ব্যক্তিগত হোক, পারিবারিক হোক কিংবা রাষ্ট্রীয়। এ কথাটি আরবিতে ব্যক্ত করা হয় ‘ইকতিসাদ’ শব্দে, যার অর্থ মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এ নামকরণ থেকেই আয়-ব্যয় ও জমা-খরচ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়। বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ অস্থির সময়ে আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনাও যেন আল্লাহ তায়ালার হুকুম ও রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা কর্তব্য।

কুরআন ও হাদিসে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের কৃতকর্মের ফলেই অনেক সময় পৃথিবীতে বিপদাপদ নেমে আসে। পাপাচার, অবিচার, প্রতারণা এবং আল্লাহর বিধান থেকে বিচ্যুতি এসবই সমাজে অস্থিরতা ও সংকট ডেকে আনে। তাই অর্থনৈতিক মন্দা বা জ্বালানি সংকটকে কেবল বাহ্যিক সমস্যা হিসেবে না দেখে  আমাদের নিজেদের আত্মসমালোচনাও করা প্রয়োজন। আমরা কি আমাদের জীবনে আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে পালন করছি? আমাদের লেনদেন কি সৎ ও ন্যায্য? আমরা কি জাকাত আদায় করছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সংকট থেকে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

মানুষ হিসেবে আমাদের ভুল-ত্রুটি হবেই। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, তওবা ও ইসতিগফারের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাই। নিয়মিত ইসতিগফার কেবল আখেরাতের মুক্তির মাধ্যম নয়; বরং দুনিয়াতেও এর সুফল প্রতিফলিত হয়। রিজিকের প্রশস্ততা, বিপদ থেকে মুক্তি এবং অন্তরের প্রশান্তি, সবই এর ফলস্বরূপ অর্জিত হতে পারে। তাই এই সংকটময় সময়ে আমাদের উচিত বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাঁর সাহায্য কামনা করা।

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সামাজিক সংহতি একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায়। ইসলামে ভ্রাতৃত্বের যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল তাত্ত্বিক নয়; বরং বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য। নবীজি (সা.)-এর সময় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আজকের সমাজে আমরা যদি নিজেদের মধ্যে এমন সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে পারি, তা হলে অনেক সমস্যারই সহজ সমাধান সম্ভব।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি। প্রথমত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে সাশ্রয়ী জীবনযাপন নিশ্চিত করা। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার, জ্বালানির অপচয় এবং বিলাসী খরচ কমিয়ে আনা জরুরি। দ্বিতীয়ত একটি সঞ্চয় পরিকল্পনা গড়ে তোলা, যাতে হঠাৎ কোনো সংকটে পড়লে তা মোকাবিলা করা সহজ হয়। তৃতীয়ত পারস্পরিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক তৈরি করা, বন্ধু, আত্মীয় বা সহকর্মীদের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে প্রয়োজনের সময় সবাই একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। এ ছাড়া সমাজের সামর্থ্যবানদের উচিত দরিদ্র ও অভাবীদের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল হওয়া। দান-সদকা, জাকাত এবং কর্জে হাসানার মাধ্যমে আমরা সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি। এটি কেবল সামাজিক দায়িত্বই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজন মুমিন কখনো একা বাঁচতে চায় না; বরং সে চায় তার আশপাশের মানুষদেরও নিয়ে নিরাপদ ও স্বস্তির জীবন গড়ে তুলতে।

সবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে। বাহ্যিক উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার পাশাপাশি তাঁর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া মুমিনের অন্যতম গুণ। দোয়া এমন একটি শক্তি, যা অদৃশ্যভাবে আমাদের জীবনে পরিবর্তন এনে দিতে পারে। সংকট যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও অনেক বড়। অতএব, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। এটি আমাদের জীবনযাত্রা পুনর্বিবেচনা করতে, আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে এবং একটি সুষম, সচেতন ও দায়িত্বশীল জীবন গড়ে তুলতে আহ্বান জানায়। আমরা যদি এই সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তা হলে এই সংকটই আমাদের জন্য কল্যাণের দ্বার উন্মোচন করতে পারে। 

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন, সংযমী জীবনযাপনের তওফিক দিন এবং সব ধরনের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   মুমিন  ইসলাম  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: