বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বড় তথ্য ফাঁস হিসেবে বিবেচিত পানামা পেপারস। যেখানে প্রকাশিত হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখের বেশি গোপন নথি। যা গ্লোবাল এলিটদের অফশোর আর্থিক নেটওয়ার্কের বিশালতা সামনে নিয়ে আসে।
২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক কনসোর্টিয়াম (আইসিআইজে) এবং জ্যুড-ডয়চে জাইতুং নামক একটি জার্মান পত্রিকা পানামাভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকা থেকে ফাঁস হওয়া ১ কোটি ১৫ লাখের বেশি নথি প্রকাশ করে। এতে বিশ্বজুড়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফশোর শেল কোম্পানির এক জটিল নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয়।
এতে ৮০টির বেশি দেশের ৩৫০ জনেরও বেশি সাংবাদিক এক বছরের বেশি সময় গোপনে কাজ করে ২.৬ টেরাবাইট ডেটা বিশ্লেষণ করেন এবং পরে তা প্রকাশ করেন।
কী ছিল পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি তে?
২০১৬ সালের এই কেলেঙ্কারির মূল বিষয় ছিল মোসাক ফনসেকা থেকে ফাঁস হওয়া ১ কোটি ১৫ লাখ গোপন নথি। যার মধ্যে ছিল ইমেইল, চুক্তিপত্র ও ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য।
এই নথিগুলোতে দেখা যায়, বিশ্বের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিশেষকরে- রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পাবলিক ফিগাররা ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ, বাহামা ও পানামার মতো ট্যাক্স হেভেনে নিবন্ধিত কোম্পানির মাধ্যমে সম্পদ লুকিয়ে রাখতেন বা স্থানান্তর করতেন, যাতে কর কর্তৃপক্ষের নজর এড়ানো যায়।
প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার প্রতিষ্ঠান বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এসব তথ্যের সময়কাল ছিল ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত।
কে ফাঁস করেছিলেন এই নথি?
‘জন ডো’ ছদ্মনাম ব্যবহার করা এক অজ্ঞাত হুইসেলব্লোয়ার প্রথমে এই তথ্যগুলো জার্মান পত্রিকা জ্যুড-ডয়চে জাইতুং এর কাছে দেন। পরে এই পত্রিকা বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য যাচাই বাছাইয়ের পর প্রকাশ করে।
এই অনুসন্ধানে যুক্ত ভারতের দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর ম্যানেজিং এডিটর পি. বৈদ্যানাথন আইয়ার বলেন, “তথ্য খুঁজে বের করার কাজটি ছিল- খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো।”
তার ভাষায়, “আমরা ছয় থেকে আট মাস প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে ডেটা পড়েছি। দিন-রাত কাজ করেছি, নিরাপদ কম্পিউটারে ডেটা বিশ্লেষণ করেছি। এটি ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ।”
কারা জড়িত ছিলেন?
এ ঘটনায় ১৪০ জনের বেশি রাজনীতিবিদের নাম উঠে আসে, যারা অফশোর শেল কোম্পানির পরিচালক, শেয়ারহোল্ডার বা উপকারভোগী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।যাদের মধ্যে ছিলেন- আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাউরিসিও মাক্রি এবং ইউক্রেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো।
এছাড়াও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং আইসল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডুর ডেভিড গানলগসন এর নামও ছিল।
অফশোর শেল কোম্পানি কী?
অফশোর কোম্পানি হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা মালিকের নিজ দেশের বাইরে নিবন্ধিত। অন্যদিকে, শেল কোম্পানি হলো এমন প্রতিষ্ঠান যার নিজস্ব কোনো প্রকৃত ব্যবসা বা কার্যক্রম নেই-মূলত কাগজে-কলমে অস্তিত্ব থাকে।
এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি অফশোর শেল কোম্পানি প্রায়ই জটিল আর্থিক লেনদেন আড়াল করতে ব্যবহৃত হয়।
এগুলো কি অবৈধ?
অফশোর শেল কোম্পানি অবৈধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে সম্পদ সুরক্ষা বা উত্তরাধিকার পরিকল্পনার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়। তবে বৈধ ও অবৈধ ব্যবহারের মধ্যে সীমারেখা খুবই সূক্ষ্ম। কর সুবিধা নিতে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আইনগত পরামর্শ নিয়ে এসব কাঠামো তৈরি করে, যা কখনো কখনো অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে।
কেউ কি শাস্তি পেয়েছেন?
তথ্য ফাঁসের এক মাসের মধ্যে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডুর ডেভিড গানলগসন গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন।
পাকিস্তানে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করে। পরে ২০১৮ সালে তাকে আজীবন রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
অন্যদিকে, মোসাক ফনসেকা ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে এবং ২০১৮ সালে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে। তবে এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইউর্গেন মোসাক এবং রামোন ফনসেকা মোরাসহ ২৬ জনকে পানামার আদালত খালাস দেয়।
কত টাকা উদ্ধার হয়েছে?
২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো প্রায় ২০০ কোটি ডলার কর, জরিমানা ও অন্যান্য মাধ্যমে উদ্ধার করেছে বলে জানায়, আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক কনসোর্টিয়াম (আইসিআইজে)।
যুক্তরাজ্য, সুইডেন ও ফ্রান্স প্রত্যেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি ডলার উদ্ধার করেছে। জাপান, মেক্সিকো ও ডেনমার্ক প্রায় ৩ কোটি ডলার করে আদায় করেছে।ভারতে প্রায় ৪২৫টি কর মামলা দায়ের হলেও আদায় হয়েছে মাত্র প্রায় ১৬ মিলিয়ন ডলার, যদিও তদন্তাধীন করের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। পানামা নিজেই উদ্ধার করেছে প্রায় ১৪.১ মিলিয়ন ডলার।
আইনি ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন এসেছে?
পানামা পেপারসের পর বিভিন্ন দেশ শেল কোম্পানির অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কর্পোরেট ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ উল্লেখযোগ্য। যেখানে কোম্পানির প্রকৃত মালিকদের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাতিসংঘও বৈশ্বিক কর কাঠামো নিয়ে নতুন কনভেনশন তৈরির চিন্তা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি করেছে।
তবে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে। বৈশ্বিকভাবে একক কোনো কর নীতি নেই। ফলে ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দেশের আইন ও চুক্তির সুযোগ নিয়ে নিজেদের সুবিধামতো কাঠামো বেছে নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থায় বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের অভাবই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
/ইউএমএইচ