একসময় সারা বছর মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত মন্দির প্রাঙ্গণ। একের পর এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান লেগেই থাকত, যাতে যোগ দিত শত শত সনাতনী ধর্মপ্রাণ মানুষ। সুদৃশ্য এ মন্দির ঘিরে গোটা এলাকা ছিল প্রাণচঞ্চল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন সব কেবলই স্মৃতি।
প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো মন্দিরটি এখন জরাজীর্ণ এবং ব্যবহার অনুপযোগী। রাক্ষুসে হালদা ক্রমেই গিলে খাচ্ছে এটি। শতবর্ষী মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণে এ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি কেউ। ফলে বর্তমানে যে স্মৃতি চিহ্ন আছে তাও অচিরেই নদীগর্ভে যাওয়ার অপেক্ষায়।
রোসাংগিরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শোয়েব আল ছালেহীন বলেন, শতবর্ষী ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। এটি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, পুরাকীর্তি সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করা হবে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার রোসাংগিরি ইউনিয়নে মন্দিরটির অবস্থান। ব্রিটিশ শাসনামলের গুরুদাশ শীল নামের এক ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে ইউনিয়নটি গঠিত হয়। সে সময়ে ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে গ্রাম সরকার বলা হতো। এর আগে রোসাংগিরী-সমিতিরহাট একটি অবিভক্ত ইউনিয়ন ছিল।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে ইউনিয়নটি বিভক্ত হয়ে রোসাংগিরি ইউনিয়ন নামে একটি স্ব-শাসিত ইউনিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রাক্ষুসে হালদা নদী। নদীর পূর্ব পাড়ে রোসাংগিরি গ্রাম। পাশেই শতবর্ষী এই নান্দনিক মন্দিরের অবস্থান। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে প্রধান সড়ক থেকে কয়েক মিনিটেই মন্দিরে পৌঁছানো যায়।
একসময় এলাকার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ছিল এটি। ছিল ব্যাপক জৌলুস। মন্দির প্রাঙ্গণ ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। নান্দনিক কারুকার্যে ভরা মন্দিরটিতে প্রবেশে রয়েছে একাধিক গোলাকার দরজা। দরজার দুই পাশে মোগল আমলীয় নকশার কাজ। মন্দিরের ভেতরে দুটি কক্ষ বেশ পরিপাটি। একটু দূরেই আছে গুরুদাশ ও গঙ্গাদাশ শীলের জরাজীর্ণ বাড়িটি।
নিয়মিত পূজা-অর্চনা আর মানুষের আনাগোনায় প্রাণচঞ্চল থাকত মন্দির প্রাঙ্গণ। এখন মন্দিরের ইট-সুরকি উঠে সেখানে জন্মেছে আগাছা আর পরগাছা। মন্দিরের অবশিষ্টাংশের চিহ্ন রয়েছে মাত্র। নদী এসে দাঁড়িয়েছে মূল মন্দিরের গা ঘেঁষে। সেখানে এখন হয় না পূজা-অর্চনা। নেই ধর্মীয় রীতির কিছুই।
দরজা-জানালাও নেই। মন্দিরের স্থাপনাজুড়ে বসেছে বিষধর সাপ আর পোকা মাকড়ের বসতি। খসে পড়ছে পলেস্তারা। মন্দিরের সব কেবলই এখন ইতিহাস। রাক্ষুসে হালদা ক্রমেই গিলে খেয়েছে মন্দিরের পাশের সম্পত্তি। এখন শুধু বাকি মন্দিরটি।
স্থানীয় বাসিন্দা শম্ভু কুমার শীল বলেন, মন্দিরটি ব্রিটিশ আমলের। ঐতিহ্যে ভরপুর মন্দিরটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নদীভাঙন থেকে মন্দির রক্ষায় কারও কোনো উদ্যোগ নেই। অচিরেই পুরো মন্দির নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সময়ের আলো/আআ