দীর্ঘদিনের বিতর্ক, প্রশ্ন আর অনিয়মের অভিযোগে ঘেরা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন অবশেষে তদন্তের আনুষ্ঠানিক ধাপ পেরিয়ে নতুন মোড়ে পৌঁছাল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত সেই নির্বাচনের ওপর গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন অবশেষে জমা দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে (এনএসসি)। ক্রীড়া অঙ্গনের চোখ এখন প্রতিবেদনের ওপর- এতে কী উঠে এসেছে এবং ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
রোববার দুপুরে এনএসসি কার্যালয়ে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, তারা নিরপেক্ষভাবে পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিয়েছেন।
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান আরও যোগ করেন, ‘আমরা যাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করেছি। সবার বক্তব্য নিয়ে যা তথ্য পেয়েছি, সেটার ভিত্তিতেই সুন্দরভাবে প্রতিবেদন তৈরি করেছি। কাউকে সরাসরি অভিযুক্ত না করে নিরপেক্ষভাবে পুরো বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’
প্রতিবেদনের মূল সুপারিশ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভবিষ্যতে বিসিবি নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে গঠনতন্ত্র সংশোধনসহ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কী ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করতে চাননি তিনি। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জানাবে বলে উল্লেখ করেন।
বিসিবি নির্বাচনে সৃষ্ট হওয়া বিতর্কের বিশেষ করে জেলা ও বিভাগীয় কাউন্সিলর মনোনয়ন এবং ক্লাব ক্যাটাগরির ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা এবং সাবেক ক্রিকেটারদের একটি অংশ নির্বাচনকে পক্ষপাতদুষ্ট, অস্বচ্ছ এবং সরকারি হস্তক্ষেপে প্রভাবিত বলে দাবি করে। এমনকি একটি পক্ষ সে সময় নির্বাচন থেকে সরেও দাঁড়িয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে গত ১১ মার্চ সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে এনএসসি। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তদন্তের অংশ হিসেবে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। জানা গেছে, তৎকালীন নির্বাচন কমিশন, বর্তমান বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে লিখিত জবাব নেওয়া হয়েছে। তবে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে ডাকা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আসিফ মাহমুদ জানান, বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন এবং বিসিবির স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় তিনি এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, তদন্ত কমিটির প্রজ্ঞাপনেই আগাম কিছু সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত ছিল।
এদিকে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় ক্রীড়াঙ্গনে কৌতূহল আরও বেড়েছে। সাধারণত এ ধরনের সরকারি তদন্ত কমিটি নীরবতা বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করে, যাতে কোনো প্রভাব ছাড়াই নিরপেক্ষভাবে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা যায়- এই ক্ষেত্রেও সেই ধারা অনুসরণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিসিবির নির্বাচন নিয়ে যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক চলছিল, তার একটি আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন এখন সামনে এসেছে। তবে এই প্রতিবেদন শুধু অতীতের হিসাব নয়, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এই সুপারিশের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয় এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রশাসনে আদৌ কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আসে কি না।
সময়ের আলো/আআ