ক্ষুদ্রান্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার অতিরিক্ত বৃদ্ধি যাকে আমরা স্মল ইন্টেস্টিনাল ব্যাকটেরিয়াল ওভারগ্রোথ (সিবো) বলি- এটি মূলত আমাদের পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার একটি জটিল অবস্থা। সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার প্রধান বাসস্থান বৃহদান্ত্রে, আর ক্ষুদ্রান্ত্রে এদের উপস্থিতি খুবই সীমিত থাকে। কিন্তু যখন কোনো কারণে এই ভারসাম্য ভেঙে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া ক্ষুদ্রান্ত্রে এসে বংশবৃদ্ধি শুরু করে, তখনই শুরু হয় নানা ধরনের হজম ও পুষ্টিজনিত সমস্যা। একজন নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে বলব সিবো শুধু ‘গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা’ নয়, বরং এটি একটি আন্ডারলাইনিং গাট ডিসঅর্ডার যা দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা এবং অন্ত্রের কার্যকারিতা নষ্ট করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সেই সঙ্গে এটি হরমোনাল ইমব্যালান্স এবং ইমিউন ফাংশনকেও প্রভাবিত করে থাকে।
সিবো হওয়ার প্রধান কারণগুলোঅন্ত্রের গতি কমে যাওয়াআমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রে একটি স্বাভাবিক পরিষ্কার প্রক্রিয়া কাজ করে, যাকে বলা হয় মিগ্র্যাটিং মোটর কমপ্লেক্স (এমএমসি)। এটি খাবারের অবশিষ্টাংশ ও অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়াকে সামনে ঠেলে দেয়। যখন এই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় যেমন ডায়াবেটিস মেলিটাস বা হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে তখন ব্যাকটেরিয়া ক্ষুদ্রান্ত্রে জমে থাকতে শুরু করে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকা বা অনিয়মিত খাওয়ার ফলে ব্যাকটেরিয়া ক্ষুদ্রান্ত্রে জমে গিয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
পাকস্থলীর অ্যাসিড কমে যাওয়াপাকস্থলীর অ্যাসিড আমাদের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি খাবারের সঙ্গে আসা ক্ষতিকর জীবাণুকে ধ্বংস করে।
দীর্ঘদিন প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (পিপিআই) ব্যবহার করলে অ্যাসিড কমে যায় (হাইপোক্লোরহাইড্রিয়া), ফলে খাবারের সঙ্গে আসা জীবাণু ধ্বংস হয় না। এতে ব্যাকটেরিয়া সহজেই ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে। এটি সিবোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরও পড়ুন
পিত্তরস ও এনজাইমের ঘাটতি ও অপারেশনপিত্তরস এবং অগ্ন্যাশয়ের এনজাইম শুধু হজমেই সাহায্য করে না, এদের হালকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল প্রভাবও রয়েছে। যদি পিত্তথলিতে সমস্যা বা অগ্ন্যাশয়ের কার্যকারিতা কমে যায়, তবে অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার নিয়ন্ত্রণ কমে যায় এবং ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
পেটে অপারেশন, স্কার টিস্যু বা ক্ষুদ্রান্ত্রে ছোট ছোট পকেট তৈরি হলে সেখানে খাবার আটকে থাকতে পারে- যা ব্যাকটেরিয়ার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
গাটের গঠনগত সমস্যাঅন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হলে সেখানে খাবার বা বর্জ্য আটকে থাকতে পারে, যা বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি করে। প্রধান কিছু গঠনগত সমস্যা হলো-
পেটে অস্ত্রোপচারের পর অনেক সময় অন্ত্রের দেয়ালে স্কার টিস্যু বা তন্তু তৈরি হয়। এগুলো অন্ত্রের স্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করে এবং নালিকে আঁকাবাঁকা করে দেয়। প্রদাহ বা অন্য কোনো কারণে অন্ত্রের ভেতরের পথ সরু হয়ে যেতে পারে। ফলে খাবারের চলাচল ধীর হয়ে যায়। ডাইভার্টিকুলা হলো অন্ত্রের দেয়ালে তৈরি হওয়া ছোট ছোট পকেট বা থলি। এই পকেটগুলোর ভেতরে খাবার বা মল আটকে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। এসব সমস্যার কারণে অন্ত্রের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় খাবার দীর্ঘক্ষণ জমে থাকে। আটকে থাকা এই খাবারে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার শুরু করে এবং খাবার পচাতে শুরু করে। এই অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়া যখন ক্ষুদ্রান্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই সিবো দেখা দেয়। এর ফলে পেটে গ্যাস, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া এবং পুষ্টির শোষণে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
ওষুধের প্রভাবঅতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে অন্ত্রের ভালো-খারাপ ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়। দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ খেলে অন্ত্রের স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যেতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলঅতিরিক্ত চিনি, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট (ময়দা, মিষ্টি) এবং প্রসেসড খাবার অন্ত্রে ‘খারাপ ব্যাকটেরিয়ার খাবার’ হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা; শারীরিক পরিশ্রমের অভাব। এসবও অন্ত্রের গতি কমিয়ে সিবোর ঝুঁকি বাড়ায়।
ইমিউন ও গাট-সম্পর্কিত রোগসিবোর সঙ্গে প্রায়ই ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস), সিলিয়াক ডিজিজ, ক্রোনস ডিজিজ, অন্ত্র ও মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী চাপ এগুলোর সম্পর্ক পাওয়া যায়।
কেন সিবো গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ?ক্ষুদ্রান্ত্রের এই অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়া শুধু গ্যাস তৈরি করে না এরা সরাসরি আমাদের পুষ্টি শোষণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। যেমন : ভিটামিন বি১২, আয়রন, এমনকি ফ্যাট- নিজেরা ব্যবহার করে ফেলে। ফলে পুষ্টিহীনতা, হঠাৎ করে ওজন বেড়ে যায় বা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস ও পেট ফাঁপা, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের (আইবিএস) মতো উপসর্গ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সিবোর চিকিৎসা করানো না হলে লিকি গাট ও সিস্টেমিক প্রদাহ তৈরি হতে পারে।
সিবোর সাধারণ লক্ষণসিবো সাধারণত ‘ফাঙ্কশনাল ডাইজেস্টিভ প্রবলেম’ হিসেবে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়-
খাওয়ার পর পেট অস্বাভাবিক ফেঁপে যাওয়া, অতিরিক্ত গ্যাস, পেটে মোচড়ানো ব্যথা বা অস্বস্তি, কখনো ডায়রিয়া, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, ক্লান্তি অনুভব করা, শরীরে ভিটামিন বি১২ বা আয়রনের ঘাটতি, ব্রেন ফগ বা মনোযোগ কমে যাওয়া। যাহোক, শেষ কথা হচ্ছে আমাদের মাথায় রাখতে হবে-
সিবো একটি ‘রুট কউজ প্রবলেম’ শুধু লক্ষণ কমালেই হবে না, বরং কেন এটি হচ্ছে তা খুঁজে বের করা জরুরি।
খাদ্যাভ্যাস, হরমোনাল সমস্যা, ওষুধের ব্যবহার সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সঠিক ডায়াগনোসিস (যেমন ব্রেথ টেস্ট); ব্যক্তিভিত্তিক ডায়েট প্ল্যান (লো ফোডম্যাপ ইত্যাদি) এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট- এই তিনটির সমন্বয়েই সিবো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
লেখক : পুষ্টিবিদএএডি/