দেশে স্বাস্থ্যসেবায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিছুটা অগ্রগতি হলেও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে চ্যালেঞ্জ বাড়ছেই। বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর ৭০ থেকে ৭১ শতাংশই হচ্ছে এসব রোগে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এখন অসংক্রামক রোগই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। অথচ এ খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অসংক্রামক রোগ এমন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা। এটি একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি কিডনি রোগ, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ, স্থূলতা বাড়ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য নানা জটিলতায় পড়ছে। এতে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য-ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের লক্ষ্য পূরণে এসব রোগ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অথচ মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হচ্ছে। এটি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অসংক্রামক রোগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না হলে এ প্রবণতা আরও বাড়বে। তাই বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য খাত গড়ে তুলতে পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শও তাদের।
এমন বাস্তবতায় আজ মঙ্গলবার বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
সকাল সাড়ে ১০টায় শাহবাগের আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
এতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী সেবা সপ্তাহ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার।
‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি জানান, রোগীর মৌলিক পরিচয়ভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে ইতিমধ্যে সব নাগরিককে ই-হেলথ কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ শুরু করেছে। শহর ও গ্রামে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
ধাপে ধাপে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি, যার প্রায় ৮০ শতাংশ হবেন নারী।
তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড, জটিল রোগের দ্রুত চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), স্বাস্থ্যবিমা বিস্তার, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার এবং সেবাদাতা-সেবাগ্রহীতার জন্য ন্যায়সংগত আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এসব লক্ষ্য অর্জনে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মানুষ, পশুপাখি ও পরিবেশ এই তিনটি উপাদান পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার মাধ্যমে সবার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান ও পরিবেশবিজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন।
তারেক বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নেই। দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিংয়ের (এমএল) মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাজেট বাড়ানো জরুরি। দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ সময়ের আলোকে বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থাকলেও মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। দ্বৈত ব্যবস্থা, জনবল সংকট ও তদারকির অভাব এর বড় কারণ। চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা বহু পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, অসংক্রামক রোগই এখন দেশের সবচেয়ে বড় নীরব স্বাস্থ্য সংকট। হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট মৃত্যুর প্রধান কারণ। এসব রোগের বড় ঝুঁকির কারণ তামাকের ব্যবহার।