ডিজিটাল যুগে আমরা যেন এক মুহূর্তও বিরক্ত হতে চাই না। একটু ফাঁকা সময় পেলেই হাত চলে যায় স্মার্টফোনে। স্ক্রল করি, ভিডিও দেখি বা নোটিফিকেশন চেক করি। মনে হয়, বিরক্তি মানে সময় নষ্ট। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, ঠিক এই বিরক্তি বা একঘেয়েমি হতে পারে সৃজনশীলতার সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস।
গবেষকদের মতে, প্রতিদিন মাত্র পনেরো মিনিট ‘বিরক্ত’ থাকলেই মাথায় আসতে পারে নতুন চিন্তা, নতুন আইডিয়া, এমনকি জীবনের বড় সিদ্ধান্তের দিকনির্দেশনাও।
আমরা সাধারণত বিরক্তিকে অলসতা বা নেতিবাচক মানসিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করি। তবে গবেষণা বলছে, এই ধারণা ভুল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর্থার সি ব্রুকস এবং গবেষক স্যান্ডি ম্যান বলছেন, আমরা যত বেশি বিরক্তিকে ভয় পাই, তত বেশি ক্ষতি করছি নিজের সৃজনশীলতাকে।
যখন আমরা কোনো কাজ করি না, তখন মস্তিষ্ক নিজেই উদ্দীপনা খুঁজতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রথমে বিরক্তিকর কোনো কাজ করেছেন, পরে সৃজনশীল কাজে যুক্ত হলে তাদের চিন্তা হয়েছে বেশি অভিনব ও গভীর। কারণ মস্তিষ্ক বাইরের কোনো উদ্দীপনা না পেলে নিজের ভেতরের জগৎ থেকে ভাবনার খোঁজ নেয়। এই ভেতরের ঘুরাঘুরি থেকেই জন্ম নেয় নতুন আইডিয়া।
মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ আছে, যাকে বলা হয় ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক। যখন আমরা কোনো নির্দিষ্ট কাজে ব্যস্ত থাকি না, তখন এটি সক্রিয় হয়। এই সময়ে আমরা জীবনের বড় বড় প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে পারি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারি বা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে পারি। কিন্তু স্মার্টফোনের স্ক্রল আমাদের এই নেটওয়ার্ককে বন্ধ করে দেয়। ফলে জীবনে অর্থহীনতা বা শূন্যতার বোধ বেড়ে যায়।
বিরক্তি লাগলেই আমরা ফোন হাতে নিই। এতে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যা সাময়িক আনন্দ দেয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য এই অভ্যাস আমাদের মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং সাধারণ কাজ থেকেও আনন্দ পাওয়ার ক্ষমতা হ্রাস করে। এর ফলে উদ্বেগ, অস্থিরতা এমনকি বিষণ্নতার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অধ্যাপক ব্রুকস বলেন, আমরা যত বেশি ফোন ব্যবহার করি, তত কমে যায় বিরক্তি সহ্য করার ক্ষমতা। আর এতে সাধারণ কাজেও আনন্দ পাওয়া যায় না।
তাহলে বিরক্তি হলে আমরা কী করব? ইয়োগা বা মেডিটেশন করতেই হবে এমন নয়। বরং এমন কিছু করা উচিত, যার জন্য কোনো মনোযোগের প্রয়োজন নেই। যেমন, মোবাইল ছাড়া নিরিবিলি হাঁটতে বের হওয়া, গান বা পডকাস্ট ছাড়া ড্রাইভিং করা, নির্দিষ্ট সময় ‘ডিজিটাল ফাস্টিং’, অথবা চুপচাপ বসে নিজের চিন্তাগুলোকে ভেসে যেতে দেওয়া।
গবেষকদের মতে, প্রতিদিন অল্প সময়ের এই বিরক্তি চর্চা করলে নতুন ও সৃজনশীল আইডিয়া আসে, মনোযোগের ক্ষমতা বাড়ে, মানসিক চাপ কমে এবং জীবনের লক্ষ্য ও অর্থ নিয়ে স্পষ্টতা তৈরি হয়। আমরা যাকে এড়িয়ে যাই, সেই বিরক্তিই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক। তাই পরেরবার লাইনে দাঁড়িয়ে বা অপেক্ষা করার সময় ফোন বের না করে একটু বিরক্ত হয়ে থাকুন। মস্তিষ্ককে ঘুরে বেড়াতে দিন নিজের মতো করে। হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে আপনার পরবর্তী বড় আইডিয়া।
সময়ের আলো/আরবিএন