বর্তমান আধুনিক বিশ্বে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান আক্রমণের ফলে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মেরুদণ্ড অনেকটাই বাঁকা হয়ে পড়েছে। সেই কালো ছায়ার আক্রান্ত আজ বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যতটা না দায়ী তার চেয়ে বড় দায় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। একদিকে সরকারিভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরেই এক বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ নিঃশব্দে গিলে খাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
একে বিশেষজ্ঞরা বলছেন অর্থনীতির এক ‘নীরব ক্যানসার,’ যা জাতীয় গ্রিডকে বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি বছরে চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়া বা এর দখল নিয়ে সংঘাতের যে গল্প আমরা রুপালি পর্দায় দেখি, বাস্তব পরিস্থিতি আজ সেদিকেই মোড় নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিমা শক্তির হস্তক্ষেপের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বর্তমানে ইরান-ইসরাইল সংঘাতের বিস্তৃতি উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে যখন জড়িয়ে ফেলছে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের মজুদ পর্যাপ্ত বলে দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি ভিন্ন এক রূঢ় সত্য তুলে ধরছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিপণিবিতান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করা, অফিস ও ব্যাংকিং সময়সীমা সংকুচিত করার মতো
পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সংকট কতটা ঘনীভূত। তেলের উচ্চমূল্য এবং সরবরাহের ঘাটতি সরাসরি আঘাত হানছে নিত্যপণ্যের বাজারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলছে।
এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতির মধ্যেই উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সারা দেশে দাপিয়ে বেড়ানো ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুসারে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শুধু এই অটোরিকশায় চার্জ দিতে ব্যয় হচ্ছে। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ। ঢাকা শহরেই যেখানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট, সেখানে এর এক-তৃতীয়াংশ যদি অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে চলে যায়, তবে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বিশাল পরিমাণ বিদ্যুতের একটি বড় অংশই সিস্টেম লসের আড়ালে চুরি হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ হুকিং এবং গ্যারেজগুলোর গোপন সংযোগের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। যে অর্থ দিয়ে দেশের জ্বালানি অবকাঠামো বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উন্নয়ন সম্ভব ছিল, তা গুটিকয়েক সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব মতে, রাজধানীতেই ১২ থেকে ১৫ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। প্রতিটি রিকশায় ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে, যা পূর্ণ চার্জ হতে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় নেয়। এই বিপুল চাহিদাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজ। ডিএমপির তথ্যমতে রাজধানীর মিরপুর, ওয়ারী, গুলশান এবং উত্তরাসহ আটটি অপরাধ বিভাগে প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং প্রায় এক হাজার গ্যারেজ রয়েছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকার মতো স্পর্শকাতর স্থানেও ফুটপাথ দখল করে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সরাসরি লাইন টেনে চার্জিং ব্যবসা চলছে।
মালিকদের দাবি, বৈধ মিটার পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা অবৈধপথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু এই বাধ্য হওয়ার আড়ালে জাতীয় গ্রিডের ওপর যে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তার ভার বহন করতে হচ্ছে পুরো রাষ্ট্রকে।
বিদ্যুৎ সংকটের এই অর্থনৈতিক ক্ষতের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক মূর্ত আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দেশের কোথাও না কোথাও এই বাহনটির কারণে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। অত্যন্ত হালকা কাঠামোর এই যানগুলোতে শক্তিশালী মোটর ও ব্যাটারি সংযোজন করায় এগুলো দ্রুতগতিতে চলতে পারে, কিন্তু এর ব্রেকিং সিস্টেম বা ভারসাম্য রক্ষা করার মতো ন্যূনতম প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই। ফলে দ্রুতগতিতে মোড় নেওয়ার সময় বা হঠাৎ ব্রেক কষলে এগুলো উল্টে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটায়। মহাসড়কে এই অটোরিকশার উপস্থিতি মৃত্যুর হারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দূরপাল্লার বাস বা ট্রাকের পাশে এই ছোট বাহন চলাচলের কারণে চালকদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটে এবং মুহূর্তের অসাবধানতায় ঝরে যায় অসংখ্য প্রাণ। এ ছাড়া মহাসড়কে গতির অসামঞ্জস্যতা এবং উল্টোপথে চলাচলের প্রবণতা এই যানটিকে একটি ভ্রাম্যমাণ মরণফাঁদে পরিণত করেছে।
দুর্ঘটনার ঝুঁকির আরেকটি কারিগরি দিক হলো এর অনিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবহার। বেশিরভাগ অটোরিকশার ব্যাটারি অত্যন্ত নিম্নমানের এবং এগুলোর সংযোগব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গ্যারেজগুলোতে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার সময় শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই চার্জিং পয়েন্টগুলো আগ্নেয়গিরির মতো কাজ করছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ ছাড়া যত্রতত্র অটোরিকশা চলাচলের ফলে সৃষ্ট যানজট মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানোর পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মৃত্যুর মিছিলকেই দীর্ঘায়িত করছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অটোরিকশাগুলো এখন একটি ‘ক্যানসারে’ পরিণত হয়েছে যা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। একদিকে এগুলো সড়কের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। রাজধানীর হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর বা টঙ্গীর মতো এলাকায় গড়ে ওঠা কয়েক হাজার অবৈধ কারখানা প্রতিদিন শত শত নতুন রিকশা তৈরি করছে। ৬০ থেকে ৮০
হাজার টাকায় একটি রিকশা কিনে অনায়াসেই রাস্তায় নেমে পড়া যাচ্ছে, কারণ চার্জ দেওয়ার জন্য অবৈধ গ্যারেজের কোনো অভাব নেই। বুয়েটের অধ্যাপকদের মতে, এই প্রবণতা যদি রোধ করা না যায়, তবে সামনের গ্রীষ্ম মৌসুমে ভয়াবহ লোডশেডিং ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না।
জাতীয় গ্রিডের ওপর এই চাপ একদিকে যেমন ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ ও যান্ত্রিক ত্রুটি বাড়াচ্ছে, তেমনি বিদ্যুৎ বিতরণে বৈষম্য তৈরি করছে।
বিআরটিএ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ ইতিমধ্যে একটি বৈদ্যুতিক যানবাহন নীতি চূড়ান্ত করার পথে রয়েছে। তবে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়, এর কঠোর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। প্রথমত রাজধানীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ৪৮ হাজারেরও বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট দ্রুততম সময়ে বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশা তৈরির কারখানাগুলো সিলগালা করা জরুরি। ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রেও সরকারকে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
তৃতীয়ত নির্দিষ্টসংখ্যক অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের জন্য পরিকল্পিত ও টেকসই চার্জিং স্টেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে সোলার পাওয়ার বা অফ-পিক আওয়ারের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
চতুর্থত এই সেক্টরে বিশাল এক জনগোষ্ঠী জড়িত। তাই ঢালাওভাবে বন্ধ না করে দক্ষ চালক তৈরি এবং নিরাপদ বাহনে তাদের রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। মহাসড়ক থেকে এই বাহনগুলোকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দিয়ে শুধু নির্দিষ্ট ফিডার রোডে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। জ্বালানি তেল নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির শিকার বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
একদিকে বহিঃশক্তির কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় অমূল্য বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে এবং সড়কে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। অটোরিকশার পেটে চলে যাওয়া ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং এর চাকায় পিষ্ট হওয়া নিরপরাধ প্রাণ— এই দুই মিলে যে ভয়াবহ বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। ঢাকাকে এবং সর্বোপরি দেশের বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হলে এই অবৈধ ও অনিরাপদ ব্যবস্থার শেকড় উপড়ে ফেলতেই হবে।
অন্যথায় কৃচ্ছ্রসাধনের সব সরকারি উদ্যোগই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে এবং বিদ্যুৎ সংকট ও সড়ক অব্যবস্থাপনার অন্ধকার আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেবে। আমাদের আগামীর বাংলাদেশ গড়ার পথে অটোরিকশার এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যাপ্তি যেন কোনোভাবেই কাল হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে রাষ্ট্র ও সমাজকে আজই কঠোর নজর দিতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
এফআর