সীমান্তে বাফার জোন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন ইসরাইল উল্টো পথে হাঁটছে। চিরস্থায়ী যুদ্ধ কৌশলের অংশ হিসেবে তারা গাজা,

2026-04-10T04:38:18+00:00
2026-04-10T04:38:18+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
সীমান্তে বাফার জোন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩৮ এএম 
ইসরাইলি হামলার পর বৈরুতের কর্নিশ আল-মাজরায়া এলাকায় একটি আবাসিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ছবি : সিএনএন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন ইসরাইল উল্টো পথে হাঁটছে। চিরস্থায়ী যুদ্ধ কৌশলের অংশ হিসেবে তারা গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার ভেতরে ‘নিরাপত্তাবলয়’ তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য শত্রুপক্ষকে পুরোপুরি ধ্বংস করা নয় বরং দুর্বল করে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এতে একদিকে সীমান্তের বাইরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংস ও আঞ্চলিক উত্তেজনা। 

বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘ, প্রায় স্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতির সূচনা হতে পারে।

যুদ্ধবিরতির মাঝেও নতুন কৌশল : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন সংঘাত থামাতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেছে, তখন ইসরাইল এক ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর ভেতরে জমি দখল করে তারা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গাজা, সিরিয়া এবং এখন লেবাননে ‘বাফার জোন’ বা নিরাপত্তাবলয় তৈরির মাধ্যমে ইসরাইল তাদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করছে। 

ইসরাইলের ছয়জন সামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে দেশটি প্রায় স্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় শত্রুপক্ষকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়— এমন উপলব্ধি থেকেই এই কৌশল তৈরি হয়েছে।

‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ ধারণা : বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের নেতৃত্ব এখন বুঝে গেছে যে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব, লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস এবং বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ফলে তাদের লক্ষ্য এখন শত্রুপক্ষকে ভয় দেখিয়ে এবং ছত্রভঙ্গ করে রাখা। 

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের নাথান ব্রাউন বলেন, ইসরাইল এমন এক ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এর মধ্যে রয়েছে, যেখানে শত্রুদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তাদের শক্তি কমিয়ে দেওয়া প্রধান লক্ষ্য। এই ধারণা অনুযায়ী, যুদ্ধ শেষ করার বদলে সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়।

লেবাননে বাফার জোন ও বাস্তুচ্যুতি : লেবাননে ইসরাইলের এই কৌশল সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। হিজবুল্লাহ ২ মার্চ রকেট হামলা শুরু করলে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল সীমান্ত থেকে লিতানি নদী পর্যন্ত একটি বাফার জোন তৈরি করা, যা লেবাননের প্রায় ৮ শতাংশ এলাকা। এই অঞ্চল থেকে লাখো মানুষকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, সীমান্তের কাছাকাছি অনেক গ্রামে প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িতে হিজবুল্লাহর অস্ত্র বা কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে এসব বাড়িকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধ্বংস করা হচ্ছে। একটি সামরিক সূত্র জানায়, সীমান্ত থেকে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা খালি করে ইসরাইলি শহরগুলোকে রকেট হামলার বাইরে রাখাই এই কৌশলের লক্ষ্য।

সীমান্তের বাইরে প্রতিরক্ষা : ইসরাইলের নতুন সামরিক নীতির একটি বড় পরিবর্তন হলো— তারা আর সীমান্তে বসে হামলার অপেক্ষা করছে না। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাফ ওরিয়ন বলেন, এখন ইসরাইল সম্ভাব্য হুমকি দেখলেই আগাম হামলা চালাচ্ছে। তার মতে, সীমান্তের ভেতরে থেকে প্রতিরক্ষা করা আর যথেষ্ট নয়। ফলে বাফার জোন তৈরি করে শত্রুপক্ষকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

বিভিন্ন অঞ্চলে দখল ও নিয়ন্ত্রণ : এই কৌশলের ফলে ইসরাইল এখন একাধিক অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। গাজায় অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও তারা অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। সিরিয়ায় হারমন পর্বত থেকে শুরু করে ইয়ারমুক নদী পর্যন্ত এবং লেবাননে বড় একটি এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, এই নিরাপত্তা বলয়গুলো তাদের সীমান্ত রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।

দখলনীতি নিয়ে বিতর্ক : তবে এই কৌশল নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ইসরাইলের কিছু ডানপন্থি নেতা, যেমন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত সীমান্ত বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। গাজা অঞ্চল দখল করে সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের কথাও বলেছেন তিনি। 

তবে সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, লিতানি নদী নতুন সীমান্ত নয় বরং এটি একটি নজরদারি অঞ্চল হবে, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালানো হবে।

গ্রাম ধ্বংস ও আইনি প্রশ্ন : ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জানিয়েছেন, সীমান্তের কাছে যেসব গ্রাম হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলো ধ্বংস করা হবে। গাজার রাফাহ ও খান ইউনিসে যেভাবে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেই মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। 

তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসামরিক সম্পত্তি ধ্বংস করা সাধারণত অবৈধ, যদি না তা সরাসরি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।

শান্তি চুক্তিতে অনাস্থা : ইসরাইলের এই কৌশলের পেছনে দীর্ঘদিনের ব্যর্থ শান্তি প্রচেষ্টাও একটি কারণ। ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়ার সঙ্গে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। 

সাম্প্র্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২১ শতাংশ ইসরাইলি বিশ্বাস করে যে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। আরেকটি জরিপে মাত্র ২৬ শতাংশ মনে করে গাজার যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ : বিশ্লেষক ওফের শেলাহ মনে করেন, বাফার জোন স্বল্পমেয়াদে নিরাপত্তা দিতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ বাড়াবে। লেবানন, গাজা, সিরিয়া ও পশ্চিম তীর— সব জায়গায় একসঙ্গে সেনা মোতায়েন রাখা কঠিন হয়ে উঠবে। 

তার মতে, শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সীমান্তে ফিরে গিয়ে মোবাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই বেশি কার্যকর হতে পারে।

এফআর


  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  ইরান  ইসরাইল  সীমান্ত  বাফার জোন  মধ্যপ্রাচ্য  যুদ্ধ  প্রস্তুতি  গাজা  লেবানন  সিরিয়া 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: