পানি পেতে মাইল পথ পাড়ি...

কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা

সারাদেশ

তপ্ত দুপুরে এক কলস পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দেওয়াই এখন খুলনার কয়রাবাসীর দৈনন্দিন নিয়তি। উপকূলীয় এই জনপদে

2026-04-10T04:54:12+00:00
2026-04-10T04:54:12+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
সারাদেশ
পানি পেতে মাইল পথ পাড়ি...
কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৫৪ এএম   (ভিজিট : ২৪০)
খুলনার কয়রা উপজেলায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে সাব-মার্সিবল থেকে কলসে করে খাবার পানি আনেন নারীরা। ছবি : সময়ের আলো
তপ্ত দুপুরে এক কলস পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দেওয়াই এখন খুলনার কয়রাবাসীর দৈনন্দিন নিয়তি। উপকূলীয় এই জনপদে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি এখন সোনার হরিণ। দীর্ঘ খরায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপ অকেজো; আর লোনা পানির দাপটে চারপাশের জলাধারগুলো পানের অযোগ্য। তীব্র এই সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাতটি ইউনিয়নের জনজীবন। 

সরকারি উদ্যোগের অভাব আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সংকটে উপকূলের এই তৃষ্ণা এখন স্রেফ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, সাতটি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই এখন হাহাকার। কোথাও সুন্দরবনের ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে ট্রলারে করে পানি কিনে আনা হচ্ছে, আবার কোথাও নিরুপায় হয়ে মানুষ পান করছে পুকুরের ময়লাযুক্ত অনিরাপদ পানি। 

আধুনিক প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে প্রাচীন পুকুর ও জলাশয়গুলো সংস্কার না করায় এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এই সংকট এখন চরমে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত পুকুর খনন না করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবেই এই সংকট বছর বছর ঘনীভূত হচ্ছে। যদিও সংকট কাটাতে কিছু সরকারি পানির ট্যাঙ্ক বিতরণ করা হয়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। খরা মৌসুমে গভীর নলকূপগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

বাগালী ইউনিয়নের দিপা রানী বলেন, বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। পুকুরের পানি খাওয়া যায় না। খড়ার সময় ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে প্রায় ৪-৫ মাস খাবার পানির সংকট থাকে। এ সময় দুই-তিন দিনের পানি কলস আর ড্রামে করে দূর থেকে নিয়ে আসি। গ্রামের ৩-৪ জন একসঙ্গে যাই। তিনি আরও বলেন, দুই-তিন বাড়ি মিলে একটা পানির ট্যাঙ্কি পাইছি, তাতে হয় না। আর পুকুরের পানি গোসল ছাড়া ব্যবহার করা যায় না। পানি নিয়ে আমাদের কষ্টের শেষ নেই।

দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে থেকে পানি সংগ্রহ করার ভোগান্তি কথা জানিয়ে কয়রা সদর ইউনিয়নের ময়না বেগম বলেন, ‘বাড়ির ব্যাটারা কাজে-কামে বাইরে থাকে। পানি আনতে হয় আমাগো। কল চাপলে পানি উঠে না। পুকুরের পানি এক দিন রেখে দিলে ময়লা পানি কলসের তলানিতে পড়ে। তখন এ পানি খাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে সাব মার্সিবলের পানি আনতে দেড় কিলোমিটার দূরে যেতে হয় হেঁটে হেঁটে। অনেক কষ্ট হয় পানি নিয়ে আসতে। অনেক সময় কলস আর ড্রাম নিয়ে আসার সময় ভ্যানে করে আসি।’

কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. লুৎফর রহমান সরদার বলেন, আমাদের ইউনিয়নে প্রায় ৬২ হাজার মানুষ বাস। বর্তমানে সুন্দরবনের একটি ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে ট্রলারে করে পানি কিনে এনে মানুষদের তৃষ্ণা মেটাতে হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে পানির ট্যাঙ্কি বিতরণ করলেও তা এখন অর্ধেক মানুষের কাছেও পৌঁছেনি। 


তিনি আরও বলেন, অনেক জায়গা টিউবওয়েল বসালেও সেগুলোতে পানি উঠছে না। অথচ ৩০ বছর আগে আমাদের পুকুরের সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল। পুকুরগুলো থেকে নিরাপদ পানি পেতাম। খরার সময় পুকুরের পানি ব্যবহার করতাম। আমরা সেই আগের নিয়মে ফিরতে চাই। পুকুরগুলো নেই বলে আজ এত জটিলতা। আমার দাবি, সরকারি উদ্যোগে পুনরায় পুকুর খনন এবং দখল হওয়া পুকুরগুলো উদ্ধার করা হোক।

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারের দেওয়া পানির ট্যাঙ্কি বিতরণে অনিয়মের কথা উল্লেখ করে একই উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, আমার ইউনিয়নে ২৭টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। ৫ আগস্টের পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজে থেকে পানির ট্যাঙ্কি দিয়েছেন। কিন্তু আসলে এসব ট্যাঙ্কি কীভাবে এবং কাদের বণ্টন করেছেন তা আমি জানি না। তিনি জানান, বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বৃষ্টির সময় খাবার পানি ধরে রাখলে তা ছয় মাস ধরে ব্যবহার করা যায়। সে জন্য পানির ট্যাঙ্কি সব পরিবারের জন্য হলে ভালো হয়।

পর্যাপ্ত সুপেয় পানির উৎস না থাকায় নিরুপায় হয়ে স্থানীয়রা পুকুরের দূষিত পানি পান করেন বলে জানিয়েছেন বাগালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সামাদ গাজী। 

তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নে ৩২টি গ্রামে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ বসবাস করেন। খরা মৌসুমে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আমাদের পুকুরের পানি খেতে হয়। পুকুরের পানি এক দিন রেখে দিলে কাদামাটি তলানিতে জমে আর ওপর থেকে পরিষ্কার পানি পান করতে হয়। 

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির পানি অনেকে ধরে রাখলেও তার কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। আমার ইউনিয়নে প্রায় পাঁচ বছরে ৪৩২টির মতো সরকারি ট্যাঙ্কি পেয়েছি। কিন্তু তা জনসংখ্যার তুলনায় কম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কয়রা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এখনই নতুন করে কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পানির ট্যাঙ্কি বরাদ্দ ও বিভিন্ন এনজিওর কার্যক্রমগুলো চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান।

খুলনা জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইব্রাহিম মো. তৈমুর বলেন, আমাদের বর্তমান প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ট্যাঙ্কি বরাদ্দের প্রজেক্ট এ বছর জুনে শেষ হবে। আমরা জুনের মধ্যেই কাজ সমাপ্তের চেষ্টা করছি।

তিনি আরও বলেন, যেসব জায়গায় টিউবওয়েল প্রজেক্ট অসফল হয়েছে, সেখানে আমরা বিকল্প পরিকল্পনা করে চলমান প্রজেক্ট সফল করার চেষ্টা করছি।

এফআর


  বিষয়:   খুলনা  কয়রা  সুপেয় পানি  হাহাকার  তীব্র সংকটে 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: