বোমার শব্দের ভেতরেও স্বপ্ন আঁকছে শিশুরা

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

লেবাননে ইসরাইলের তীব্র বোমাবর্ষণে যখন হাজার হাজার পরিবার ঘরছাড়া, তখন এক শিল্পী শিশুদের জন্য তৈরি করছেন এক টুকরো নিরাপদ জায়গা।

2026-04-10T04:40:22+00:00
2026-04-10T04:41:25+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বোমার শব্দের ভেতরেও স্বপ্ন আঁকছে শিশুরা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৪০ এএম  আপডেট: ১০.০৪.২০২৬ ৪:৪১ এএম
বৈরুতের শিল্পী আবেদ আল কাদিরি বাস্তুচ্যুত শিশুদের নিয়ে ছবি আঁকার কর্মশালা করছেন। ছবি: বিসিবি
লেবাননে ইসরাইলের তীব্র বোমাবর্ষণে যখন হাজার হাজার পরিবার ঘরছাড়া, তখন এক শিল্পী শিশুদের জন্য তৈরি করছেন এক টুকরো নিরাপদ জায়গা। বৈরুতের শিল্পী আবেদ আল কাদিরি বাস্তুচ্যুত শিশুদের নিয়ে আঁকার কর্মশালা করছেন, যেখানে তারা নিজেদের দুঃখ, ভয়, আনন্দ আর স্বপ্ন কাগজে ফুটিয়ে তুলছে। 

বড় ক্যানভাসে যৌথভাবে আঁকা এই ছবিগুলো একদিন জনসমক্ষে প্রদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও এই উদ্যোগ শিশুদের জন্য হয়ে উঠেছে মানসিক স্বস্তির এক আশ্রয়।

যুদ্ধের ভেতর শিল্পের আশ্রয় : শিল্পী আবেদ আল কাদিরি বাস্তুচ্যুত শিশুদের জন্য এক ধরনের ‘নিরাপদ সাদা জায়গা’ তৈরি করে দিচ্ছেন, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে পারে। এই জায়গাটি কোনো বাস্তব আশ্রয়কেন্দ্র নয়, বরং একটি প্রতীকী মানসিক পরিসর— যেখানে কাগজ, রং আর কল্পনা মিলিয়ে শিশুরা যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে সাময়িক মুক্তি পায়। তিনি শিশুদের নিয়ে বড় আকারের একটি যুদ্ধকালীন দেয়ালচিত্র তৈরি করছেন, যা একদিন জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার ইচ্ছা রয়েছে। 

এই উদ্যোগ শুধু শিল্পচর্চা নয়, বরং যুদ্ধের মানসিক চাপ সামাল দেওয়ার একটি উপায় হিসেবেও কাজ করছে। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাদিরি বুঝতে পেরেছেন, শিশুদের জন্য এমন একটি জায়গা তৈরি করা জরুরি, যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করবে এবং নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবে।

চারবার বাস্তুচ্যুত এক শিল্পীর গল্প : বৈরুতে জন্ম নেওয়া আবেদ আল কাদিরি নিজেও এই সংঘাতের শিকার। ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাবে, যা সরাসরি লেবাননকে প্রভাবিত করেছে, তিনি চারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশেষ করে মার্চের শুরুতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং রাজধানীর কিছু অংশে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। গত মাসে তিনি তার ছেলেকে নিয়ে বৈরুতের স্টুডিওতে ছিলেন, ঠিক তখনই কাছের একটি হোটেলে হামলা হয়। 

তিনি বলেন, তাদের আর হামলার স্থানের মধ্যে শুধু একটি রাস্তা ছিল, আর সেই মুহূর্ত থেকেই তাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার যাত্রা শুরু। এই অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং তার শিল্পচর্চাকে নতুন দিক দেয়।

রাজনৈতিক সংকটে শিল্পের প্রতিক্রিয়া : আবেদ আল কাদিরির কাজ বরাবরই অঞ্চলের বড় রাজনৈতিক ঘটনা, সংকট ও সংঘর্ষের প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে উঠেছে। ২০২০ সালের ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দর বিস্ফোরণ, ২০২৩ সালের গাজা গণহত্যা এবং ২০২৪ সালের লেবানন সংঘাত; এসবই তার শিল্পে প্রতিফলিত হয়েছে। বর্তমান যুদ্ধও তাকে নতুনভাবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। 

তিনি ‘আজ আমি একটি গাছ হতে চাই’ শিরোনামে আবেগঘন কয়লার দেয়ালচিত্রের একটি সিরিজ তৈরি করেছেন। তার ভাষায়, শিল্পই তার আশ্রয় এবং প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। 

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নীরব থেকে শুধু সংকটের মধ্যে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। শিল্প তার কাছে এক ধরনের থেরাপি, যা অন্যায় ও ধ্বংসের অভিজ্ঞতা কিছুটা হলেও কমিয়ে দেয়।

ক্যানভাসে নিরাপত্তা ও অনুভূতির আশ্রয় : যখন হামলা তীব্র হচ্ছিল, তখন এক রাতে তিনি তার ছেলেকে নিয়ে স্টুডিওতে বসে আঁকছিলেন। সেই সময় তারা বাইরের বাস্তবতা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন থাকতে পেরেছিলেন। তার ভাষায়, যখন চারপাশের পৃথিবী জ্বলছে, তখন একটি ক্যানভাস নিরাপদ জায়গায় পরিণত হয়, যেখানে মানুষ তার মানসিক ও আবেগগত অনুভূতি উজাড় করে দিতে পারে। এই অভিজ্ঞতাই তাকে অনুপ্রাণিত করে বাস্তুচ্যুত শিশুদের সঙ্গে কাজ করার জন্য। 


তিনি বলেন, পরিস্থিতির কারণে তিনি যেন অবশ হয়ে গিয়েছিলেন এবং একা কোনো শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারছিলেন না। রাস্তায় বাস্তুচ্যুত মানুষদের দেখে, বিশেষ করে শিশুদের মুখ দেখে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। কয়েক দিন ধরে তিনি সেই শিশুদের মুখ স্বপ্নে দেখতেন।

শিশুদের সঙ্গে আঁকার কর্মশালা : এ পর্যন্ত তিনি ছয়টি প্রতিষ্ঠানে আঁকার কর্মশালা পরিচালনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বাইসুর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শুইফাত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কেন্দ্র। এসব জায়গায় শিশু ও তাদের পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। কর্মশালায় শিশুদের বড় বড় কাগজে একসঙ্গে আঁকতে দেওয়া হয়, যা তাদের জন্য আনন্দদায়ক এবং মুক্তির অনুভূতি এনে দেয়। এই ‘নিরাপদ সাদা জায়গা’ তাদের নিজেদের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ এবং স্বপ্ন প্রকাশের সুযোগ দেয়। শিশুদের আঁকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লেবাননের পতাকা, প্রকৃতির উপাদান এবং তাদের নিজেদের ঘরের ছবি। তারা নিজেদের ঘর থেকে দূরে কঠিন পরিস্থিতিতে বসবাস করছে, যা খুবই কষ্টকর এবং দুঃখজনক। 

তবে কাদিরি বলেন, শিশুদের মধ্যে একটি বিশেষ গুণ রয়েছে— তারা কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়েও মুহূর্তে আনন্দ খুঁজে নিতে পারে, যা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হারিয়ে ফেলে।

সহায়তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : প্রতিটি কর্মশালার শেষে শিশুদের রঙ, খাতা এবং আঁকার সামগ্রী দেওয়া হয়, যা কাদিরি নিজে অর্থায়ন করে দিয়েছেন। তিনি তার শিল্পী বন্ধুদেরও আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তারা শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য সহায়তা প্রদান করে। 

এখন পর্যন্ত ১০০-এর বেশি শিশু এই প্রকল্পে অংশ নিয়েছে এবং তিনি এই সংখ্যা ১,০০০-এ পৌঁছাতে চান। তার পরিকল্পনা রয়েছে এই দেয়ালচিত্রগুলো প্রদর্শন করার এবং এগুলোকে লেপোরেলো বই আকারে প্রকাশ করার। এই কাজগুলো ভবিষ্যতের জন্য একটি দলিল হয়ে থাকবে, যা দেখাবে কঠিন সময়েও শিল্প কীভাবে মানুষের অনুভূতি প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

এফআর


  বিষয়:   লেবানন  ইসরাইল  তীব্র  বোমাবর্ষণ  স্বপ্ন  আঁকছে  শিশুরা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: