লেবাননে ইসরাইলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় নতুন করে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর আসছে, ঠিক এমন সময়ই শুরু হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা। সর্বশেষ হামলায় অন্তত ১৩ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের কর্তৃপক্ষ। এর আগে একদিনেই আড়াইশ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এই পরিস্থিতি যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে- বিশেষ করে লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়বে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে। ইরান বলছে, যুদ্ধবিরতি পুরো অঞ্চলজুড়ে কার্যকর হওয়ার কথা, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাবি করছে, লেবাননের সংঘাত আলাদা এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির অংশ নয়। এই অবস্থানের মধ্যেই ইসরাইল লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে এবং নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে মাঠের বাস্তবতা এখনও ভিন্ন। হামলা অব্যাহত রয়েছে, আর সেই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হতে যাওয়া এই আলোচনার মূল লক্ষ্য বড় কোনো চুক্তি নয়- বরং অন্তত সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার মতো একটি ভিত্তি তৈরি করা।
লেবাননে হামলা অব্যাহত, যুদ্ধবিরতি নিয়েই মতভেদ : লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইল ব্যাপক হামলা চালায়, যেখানে একদিনেই ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এরপরও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় হামলা অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ হামলায় অন্তত ১৩ জন লেবানিজ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ অঞ্চলে এই হামলা চালানো হয়, যেখানে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য জরুরি উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এই হামলাগুলোকে ইরান সরাসরি যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতি শুধু ইরান নয়, বরং পুরো সংঘাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত ছিল। পাকিস্তানও প্রথমদিকে এই অবস্থানকে সমর্থন করেছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নয়। তাদের মতে, লেবাননের সংঘাত আলাদা এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না। এই মতবিরোধই এখন পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
হামলার মধ্যেই কূটনৈতিক চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা : লেবাননের পরিস্থিতি যাতে পুরো আলোচনাকে ভেঙে না দেয়, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলে হামলার তীব্রতা কমানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, লেবাননে উত্তেজনা কমানো এখন কার্যত আলোচনার পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে। কারণ এই হামলা অব্যাহত থাকলে ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। তবে ইসরাইলের অবস্থান এখনও পুরোপুরি নমনীয় হয়নি। তারা জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর হামলার মাত্রা কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে ইসরাইল লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে একটি বৈঠক আয়োজন করতে পারে বলে জানা গেছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম শিগগিরই ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন- যা এই নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি এখনও বন্ধ, বাড়ছে বৈশ্বিক চাপ : যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালি এখনও পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়নি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে স্বাভাবিকের ১০ শতাংশেরও নিচে। ইরানের নিজস্ব জাহাজগুলো সীমিতভাবে চলাচল করছে, কিন্তু অন্যান্য দেশের জাহাজ কার্যত আটকে রয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যেই অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ০.৯ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে প্রণালি স্বাভাবিক করছে না। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে কোনো ধরনের শুল্ক আদায়ের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। অন্যদিকে ইরান এই প্রণালিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে। আলোচনায় তারা এই জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে প্রভাব বিস্তারের অধিকার দাবি করতে পারে।
ইসলামাবাদে আলোচনায় কী হতে যাচ্ছে : এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা। শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা, যা প্রাথমিকভাবে দুই দিন চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন ট্রাম্পের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। ইরানের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। এই আলোচনার বৈশিষ্ট্য হলো- এটি সরাসরি মুখোমুখি বৈঠক নয়। দুই পক্ষ একই হোটেলে থাকলেও আলাদা কক্ষে বসবে এবং পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বার্তা আদান-প্রদান করবে। এই ধরনের আলোচনাকে কূটনৈতিক ভাষায় ‘প্রক্সিমিটি টকস’ বলা হয়। ইসলামাবাদ শহরকে এ উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে লকডাউন জারি করা হয়েছে।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা : এই আলোচনায় বড় কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং মূল লক্ষ্য হলো- দুই পক্ষকে সংলাপে ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করা। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এটিকে একটি ‘মডেস্ট গোল’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যদি এই বৈঠক থেকে শুধু আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে সম্মতি আসে, সেটিই হবে বড় সাফল্য। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার আগে বলেছেন, তারা ইতিবাচক ফল আশা করছেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান যদি আলোচনায় ‘চালাকি’ করার চেষ্টা করে, তা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নেবে। অন্যদিকে ইরানও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক কর্মসূচির স্বীকৃতি এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এখনও বেশ বড়।
অনিশ্চিত আলোচনার ভবিষ্যৎ : সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে লেবাননে হামলা অব্যাহত, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি এখনও পুরোপুরি খোলা হয়নি। এর মধ্যেই শুরু হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা। এই বাস্তবতায় ইসলামাবাদের বৈঠক তাৎক্ষণিক সমাধান এনে দেবে; এমন প্রত্যাশা খুব কমই রয়েছে। তবে যদি এই আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা কমানো যায় এবং সংলাপ চালু রাখা যায়, সেটিই আপাতত সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
সামান্য ইতিবাচক ইঙ্গিত : সব জটিলতার মাঝেও কিছু ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় আগ্রহের কথা বলা হয়েছে, একই সঙ্গে সতর্ক বার্তাও রাখা হয়েছে; আলোচনায় আন্তরিকতা না থাকলে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ইরানের দিক থেকেও আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর ইঙ্গিত এসেছে। ১১ এপ্রিল শুরু হওয়া এই বৈঠক একদিনে শেষ না হয়ে পরবর্তী দিনগুলোতে গড়াতে পারে, কিংবা পরবর্তী দফার আলোচনার সূচি নির্ধারণ করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের বৈঠককে অনেকেই ‘শুরুটা ধরে রাখার চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন। বড় কোনো সাফল্য না এলেও, যদি আলোচনার পথ বন্ধ না হয়- সেটাই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অর্জন।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে ‘সঠিক পক্ষে’ থাকার আহ্বান মুজতবা খামেনির : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি সরাসরি বার্তা দিয়েছেন, যেখানে তিনি তাদের ‘সঠিক পক্ষে’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি ইঙ্গিত করেন, বর্তমান সংঘাত শুধু সামরিক নয়, বরং একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। খামেনির ভাষায়, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে আসছে এবং নতুন বাস্তবতায় দেশগুলোকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন, ‘অহংকারী শক্তির’ প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বার্তার মাধ্যমে ইরান একদিকে তার শক্তির প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরি করছে। তবে বাস্তবে এসব দেশ ইরানের আহ্বানে সাড়া দেবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল এই অঞ্চলগুলোর অনেক দেশই।
হরমুজে নিখোঁজ ২০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন ড্রোন : ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক নজরদারি ড্রোন এমকিউ-৪সি ট্রাইটন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই ড্রোনটি মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ড্রোনটি নজরদারি মিশন শেষ করে ইতালির সিগোনেলা ঘাঁটিতে ফিরছিল। তবে হঠাৎ করেই এটি ‘কোড ৭৭০০’ জরুরি সংকেত পাঠাতে শুরু করে, যা সাধারণত বড় ধরনের বিপদের ইঙ্গিত দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই এটি উচ্চতা হারাতে থাকে এবং রাডার থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক ব্যবস্থার ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার : মাত্র ৪০ দিনের সংঘাতে ইরান ব্যাপক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও সেতুসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, যার প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
আল-আরাবিয়ার প্রতিবেদনে জেরুজালেম পোস্টের তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে ইরানের মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার সমান। ইরানের রেডক্রস সোসাইটির প্রধান পিরহোসেন কোলিভান্ড জানিয়েছেন, যুদ্ধে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ আবাসিক বাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ বাণিজ্যিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। ৩৩৯টি হাসপাতাল, ফার্মেসি, ল্যাবরেটরি ও জরুরি সেবা কেন্দ্র ধ্বংস বা অচল হয়ে গেছে। শিক্ষা খাতে ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। অন্তত ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ৮৫৭টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি রেডক্রসের ২০টি স্থাপনাও ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে সামরিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের খোজির, পারচিন, হাকিমিয়েহ ও শারাউদসহ চারটি প্রধান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং ২৯টি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৪০ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক ব্যয় ১৭.৫ বিলিয়ন ডলার : ইসরাইলের জন্যও এই যুদ্ধ আর্থিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ৪০ দিনের সংঘাতে দেশটির প্রাথমিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭.৫ বিলিয়ন ডলার, যা এখনও পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়। এর মধ্যে সরাসরি সামরিক ব্যয়ই প্রায় ১২.৯ বিলিয়ন ডলার। কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান হামলা এবং রিজার্ভ সৈন্য মোতায়েন- সব মিলিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার খরচ দ্রুত বেড়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতের জন্য অতিরিক্ত ২.৩ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা তহবিল রাখা হয়েছে, যা অনিশ্চিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে।
যুদ্ধের প্রভাব ইসরাইলের অভ্যন্তরেও গভীরভাবে পড়েছে। এখন পর্যন্ত ২৮ হাজার ২৩৭টি ক্ষতিপূরণের আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে ভবন, যানবাহন ও যন্ত্রপাতির ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত।
লেবাননে ইসরাইলের বোমা হামলায় চরভদ্রাসনের এক নারী নিহত : এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান (ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল) যুদ্ধে লেবাননে ইসরাইলের বোমা হামলায় ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার দিপালী (৩৪) নামে এক নারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বুধবার রাতে লেবাননের বৈরুতে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলার পূর্ব চর শালেপুর গ্রামের বাসিন্দা সেক মুকার মেয়ে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দিপালী চতুর্থ।
দিপালী নিহতের বিষয়ে শুক্রবার রাতে তার ছোট বোন লাইজু বেগম মুঠোফোনে সময়ের আলোর ফরিদপুর প্রতিনিধিকে জানান, প্রতিদিনের মতো ইমোতে বুধবার বিকালে দিপালীর সঙ্গে কথা হয় তার। দিপালী প্রায় দুই বছর ধরে লেবাননে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে এক মাস আগে তিনি তার গৃহকর্তার পরিবারের সঙ্গে লেবাননের বৈরুতে আশ্রয় নেয়। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার বিকালে ইমোতে ফোন করে দিপালীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন লাইজু। পরে তার মালিকের পরিবারের অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। পরে দিপালীর মালিকের এক ছেলের বউয়ের সঙ্গে কথা হলে জানতে পারেন বুধবার বোমা হামলায় তার বোন দিপালীসহ মালিক ও তার পরিবারের আরও ছয়জন মারা গেছেন।
দিপালীর মরদেহ বর্তমানে লেবাননের বৈরুতে একটি হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে আছে বলে জানান লাইজু। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চর হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সেক ফালু বলেন, দিপালী পরিবারের অভাব ঘোচাতে বিদেশে গিয়েছিল। তিনি দিপালীর মরদেহ দ্রুত দেশে আনার অনুরোধ জানান।
দিপালীর মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুরাইয়া মমতাজ বলেন, তিনি দিপালী নিহত হওয়ার খবর পেয়েছেন। তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। মেয়েটির মরদেহ দেশে আনার ব্যাপারে বিধি মোতাবেক সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া এই ঘটনায় পরিবারটির প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।
এএডি/