কুরবানির পশুর চামড়া প্রক্রিয়ায় লবণ ঘাটতির আশঙ্কা

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম

সারাদেশ

মৌসুমের শেষ সময়ে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে দেশের কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ। জমির বিপুল লবণ মিশে গেছে পানিতে।

2026-04-11T04:01:19+00:00
2026-04-11T04:01:19+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
লবণের মাঠে কালবৈশাখীর তাণ্ডব
কুরবানির পশুর চামড়া প্রক্রিয়ায় লবণ ঘাটতির আশঙ্কা
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:০১ এএম 
লবণের মাঠে কালবৈশাখীর তাণ্ডব । ছবি : সময়ের আলো
মৌসুমের শেষ সময়ে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে দেশের কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ। জমির বিপুল লবণ মিশে গেছে পানিতে। কক্সবাজার-চট্টগ্রামে হাজার একর জমিতে চার দিন ধরে বন্ধ উৎপাদন। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক লবণ উৎপাদন হয়নি। এতে চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। বৈরী আবহাওয়ায় অব্যাহত থাকবে আরও কয়েক দিন। এ সময় লবণ উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা ব্যাহত হতে পারে। উৎপাদন ঘাটতি হলে বাজারে দেখা দেবে লবণ সংকট। কুরবানির ঈদে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। উৎপাদন কাজে যুক্ত চাষিরা জানান, লবণ তৈরি হয় সমুদ্রের লোনা পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে। সূর্যের তাপ ও বাতাসের সাহায্যে লোনা পানি শুকানো হয়। পরে লবণের দানা তৈরি হয়। সমুদ্রের পানিকে বড় বড় লবণ মাঠ বা জমিতে আটকে রাখা হয়। এরপর সূর্যের তাপ-বাতাসে পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যায়। পরে নিচে পড়ে থাকা লবণ সংগ্রহ করা হয়। সহজভাবে সমুদ্রের লোনা পানি শুকিয়ে তৈরি করা হয় লবণ। 

দেশে লবণ উৎপাদন সরবরাহ মনিটরিং করতে পৃথক সেল আছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক)। সংস্থার কক্সবাজার এলাকার লবণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, চাষাবাদ কম হওয়া এবং বৈরী আবহাওয়ায় এবার ৮ লাখ টন লবণ উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা করছি। গত ৬ এপ্রিল থেকে লবণ উৎপাদন বন্ধ মাঠে। আমরা আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন শুরু হবে।
আরও পড়ুন

এবার চাষির সংখ্যা কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত বছর লবণ মৌসুমে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ৪১ হাজার চাষি যুক্ত ছিলেন। এবার জমির পরিমাণ কম থাকায় চাষির সংখ্যা দুই হাজার কমে ৪১ হাজারে দাঁড়িয়েছে। গেল কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন ৩০ হাজার টন করে লবণ উৎবাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বিসিক সূত্র জানায়, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কিছু অংশে লবণ উৎপাদন হয়। এসব অঞ্চলে গত বছর ৬৯ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছিল। এবার চাষ হচ্ছে ৬২ হাজার একর জমিতে। গত বছরের চেয়ে এবার ৭ হাজার হেক্টর কম জমিতে চাষ হচ্ছে। চলতি বছর দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিকটন। চলতি মৌসুমে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিকটন। গড়ে প্রতিদিন ৩০ হাজার টন করে লবণ উৎপাদন হয়। ৬ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত চার দিনে এক লাখ ২০ হাজার টন লবণ উৎপাদন কম হয়েছে। দেশের লবণের জেলা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় কিছু লবণ উৎপাদন হয়। কক্সবাজারের মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার সদর, টেকনাফে আছে লবণ মাঠ। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর উপজেলার গন্ডামারাসহ কিছু এলাকায় উৎপাদিত হয় লবণ। মূলত এসব এলাকার লবণ দিয়েই দেশের বার্ষিক চাহিদা পূরণ হয়। 

মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কক্সবাজারে ৬২ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে। ৬৫ হাজার একরে চাষাবাদের সক্ষমতা থাকলেও হচ্ছে না। এবার ১১ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়নি। চাষিরা লবণ চাষে আগ্রহী হয়নি। তাই বিপুল জমি পড়ে আছে খালি। এই অবস্থায় চলতি মৌসুমে উৎপাদনে বড় ঘাটতির শঙ্কা বেড়েছে। 

কক্সবাজার লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল কোম্পানি সময়ের আলোকে বলেন, লবণ উৎপাদনে আবহাওয়া একটি বড় ফ্যাক্টর। আবহাওয়া ভালো থাকলে উৎপাদন ভালো হয়। ভালো না থাকলে ভালো হয় না। কয়েক দিনের কালবৈশাখীতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে লবণ উৎপাদন। এতে চলতি মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখা কঠিন হবে। 

লবণ উৎপাদন বিঘ্নিত হলে দেশের চামড়া শিল্পের ক্ষতি হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কুরবানির সময় কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে সারা দেশে সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিকটন লবণ লাগে। প্রাকৃতিক বৈরী আবাহওয়া উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় চামড়া শিল্পে লবণ সরবরাহ চাহিদা অনুযায়ী নাও হতে পারে। এতে কুরবানির কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়া করতে আড়তদারদের ব্যয় হবে বেশি। 

লবণ মিল মালিকরা জানান, বছরের নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের মৌসুম। মৌসুমের শুরুটা ভালোভাবে হলেও শেষ দিকে আবহাওয়া বৈরী হয়ে পড়েছে। গেল কয়েক দিন ধরে কক্সবাজার এলাকায় ছিল কালবৈশাখীর তাণ্ডব। আবহাওয়া অধিদফতর আরও কয়েক দিন বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করার তথ্য দিয়েছে। গেল মঙ্গলবার ও বুধবার রাতের তাণ্ডবে লবণ উৎপাদন বন্ধের মুখে পড়েছে। লবণ মাঠ উৎপাদন উপযোগী করতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন চাষিরা। 

চট্টগ্রামের বাঁশখালী, কক্সবাজারের মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়ার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার পরিবেশ ভালো নেই। মৌসুম শুরুর পর নানা বৈরী পরিবেশ লবণ উৎপাদনে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। প্রথমে ছিল কুয়াশার দাপট। এখন যুক্ত হয়েছে কালবৈশাখীর তাণ্ডব। ভারী বৃষ্টি না হলেও বৈরী আবহাওয়া নিয়ে তারা চিন্তিত। এরপরও মৌসুমের শেষ দিকে এসে উৎপাদন ভালো হচ্ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। কবে আবার মাঠে নামতে পারবেন তা নিয়ে আছে অনিশ্চয়তা। তবে মাঠ উৎপাদন উপযোগী করার প্রস্তুতি আছে চাষিদের।

লবণ চাষিদের আছে এলাকাভিত্তিক সমিতি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারা সমিতি ঘোনার সভাপতি আবু আহমদ বলেন, আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। বলতে গেলে চলতি মৌসুমের মধ্যে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছি। আমরা এলাকাভিত্তিক ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করে দেখছি। কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা যাচাই শেষে বলা যাবে। তবে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে না।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন বলেন, লবণ উৎপাদন করতে গিয়ে এবার আমরা অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছি। গেল কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বলতে গেলে আমাদের অপুরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আমরা আশা করছি লবণ মাঠ আবার উৎপাদন উপযোগী হবে। তবে এবার বৈরী আবাহওয়ার কারণে টার্গেট অনুযায়ী উৎপাদন হবে না।

বাঁশখালীতে লবণের মাঠ কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, একসময় প্রচুর জমিতে লবণ উৎপাদন হতো। কিন্তু গন্ডামারা এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রাসে চলে গেছে লবণ চাষের বহু জমি। তাই এমনিতেই এই এলাকায় উৎপাদন কমেছে। এবার বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশে উৎপাদন আরও কমেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন মোড় এলাকায় কাঁচা চামড়ার বৃহত্তম আড়তের অবস্থান। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি থেকে কুরবানির চামড়া আসে এসব আড়তে। পাঁচ জেলার বাইরেও বিভিন্ন জেলা থেকে কুরবানির চামড়া প্রক্রিয়াজাতের কাজ চলে এসব আড়তে। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে বড় উপকরণ লবণ। আড়তদাররা মনে করেন লবণের সরবরাহ ঘাটতি হলে তারা বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বেন।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, লবণের ঘাটতি হলে চামড়া প্রক্রিয়াজাতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। লবণ মাঠ উৎপাদন কম হলে সরবরাহ কমে যায়। বাজারে বস্তা প্রতি লবণের দাম বাড়ে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আড়তে। কারণ কাঁচা চামড়া ট্যানারিতে নেওয়ার আগ পর্যন্ত লবণ দিয়েই রাখা হয়। লবণের পরিমাণ কম হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। সরবরাহ কম হলে চামড়া প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো চামড়া শিল্পে।

লবণের দাম নিয়ে তিনি বলেন, আমরা এখন প্রতি ৭৪ কেজির বস্তা লবণ ক্রয় করছি ৬৮০ টাকা করে। গেল রমজানের সময় বস্তা প্রতি লবণের দাম আরও বেশি ছিল। সরবরাহে ব্যাহত হলেই লবণের দাম ওঠানামা করে। আশা করছি মৌসুমের শেষ সময়ে লবণ উৎপাদন স্বাভাবিক হবে। অন্যথায় আড়তে সংকট দেখা দিতে পারে।

এএডি/


  বিষয়:   লবণ  মাঠ  কালবৈশাখী  তাণ্ডব  কুরবানি  পশু  চামড়া  আশঙ্কা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: