আইএস থেকে ফিরে জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

আজ যদি আপনি তারিনা শাকিলের সঙ্গে দেখা করেন, তা হলে বুঝতেই পারবেন না যে এই মানুষটি একসময় সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অপরাধে কারাভোগ

2026-04-12T02:40:52+00:00
2026-04-12T02:40:52+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আইএস থেকে ফিরে জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৪০ এএম 
সংগৃহীত ছবি
আজ যদি আপনি তারিনা শাকিলের সঙ্গে দেখা করেন, তা হলে বুঝতেই পারবেন না যে এই মানুষটি একসময় সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অপরাধে কারাভোগ করেছেন। তিনিই প্রথম ব্রিটিশ নারী, যিনি ইসলামিক স্টেটে যোগ দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। এখন ৩৬ বছর বয়সি তারিনা শাকিলকে এখন আকর্ষণীয় দেখায়। তার চেহারায় ভারী মেকআপ, এলোমেলো লম্বা চুল। বার্মিংহামের একটি বিলাসবহুল হোটেলে দেখা হলে তিনি পরিপাটি পোশাক, চওড়া বেল্ট এবং লুইস ভ্যুটন ব্যাগ নিয়ে হাজির হন। তার আচরণ প্রাণবন্ত, আন্তরিক এবং খোলামেলা। 

এক কথায়, ‘সন্ত্রাসবাদে দণ্ডিত’ বলতে যে চিত্র ভেসে ওঠে, তিনি ঠিক তার মতো নন। বরং তিনি দেখতে একেবারে একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারের মতো এবং সেটাই এখন তিনি হওয়ার চেষ্টা করছেন। টিকটকে তার প্রায় ৫০ হাজার অনুসারী রয়েছে। সেখানে তিনি সম্পর্ক নিয়ে পরামর্শ দেন; প্রায়ই গাড়িতে বসে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন। তার ভিডিওতে কখনো হাস্যরস, কখনো ডেটিং নিয়ে উপদেশ, আবার কখনো থাকে গা ছমছমে বাস্তবতা যেমন পারিবারিক সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসার কথা। নিজের অতীত তিনি সরাসরি বলেন না, তবে স্বীকার করেন যে অতীত অভিজ্ঞতার ছাপ তার ভিডিওতে থাকে।

এই জায়গায় আসাটা তার নিজের কাছেও অপ্রত্যাশিত। ২০১৪ সালে তিনি এক বছরের ছেলেকে নিয়ে সিরিয়ায় পালিয়ে যান। তখন যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ৯০০ মানুষ, যার মধ্যে প্রায় ১৫০ জন নারী, ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে গিয়েছিল। এই নারীদের ‘জিহাদি বধূ’ বলা হতো এবং সংবাদমাধ্যমে তাদের নিয়ে প্রচুর আলোচনা হতো। শাকিলকে একসময় ‘টাউই জিহাদি’ বলা হয়েছিল, কারণ তিনি জনপ্রিয় টিভি শো ‘দ্য অনলি ওয়ে ইজ এসেক্স’ পছন্দ করতেন। কিন্তু সিরিয়ায় পৌঁছে খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ভয়াবহ ভুল করেছেন। তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। এই স্বল্প সময়ই তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

ইউরোপ থেকে যারা সিরিয়ায় গিয়েছিল, তাদেরকে অনেক সময় চূড়ান্ত খারাপ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু শাকিলের গল্প আরও জটিল প্রশ্ন তোলে কীভাবে এমন একটি গোষ্ঠী কারও কাছে মুক্তির পথ মনে হতে পারে? আর এত কিছুর পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গল্পটা কেমন?

গত এক দশক ধরে শাকিল সেই চেষ্টাই করছেন কারাবাস, পুনর্বাসন, ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং এখন নতুন করে জীবন শুরু করা। তিনি বলেন, মানুষ তার বর্তমান জীবন কল্পনাও করতে পারে না, কিন্তু তিনি দ্বিতীয় সুযোগে বিশ্বাস করেন। শৈশবে তার জীবন ছিল অস্থির। তার বাবা বারবার কারাগারে যেতেন, পরিবারে সহিংসতার পরিবেশ ছিল।

ছোটবেলায় তিনি স্বপ্ন দেখতেন, কেউ এসে তাকে উদ্ধার করবে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও ২০ বছর বয়সে প্রেম করে বিয়ে করেন এবং পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তার স্বামীই তাকে সুখী করবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন সম্পর্ক ছিল অস্থির এবং তিনি একাকী হয়ে পড়েন।

ধীরে ধীরে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। জীবনের কষ্টের মধ্যে এটি তাকে আশ্রয় দেয়। এই সময়েই তার জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। কারণ কখনো বাবা-মায়ের কাছে, কখনো আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হয়। ২০১৪ সালে তার স্বামী বিদেশে গেলে তিনি ফেসবুকে আবার সক্রিয় হন। সেখানে সিরিয়ায় থাকা এক যোদ্ধার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। সে তাকে বোঝায়, শরিয়াহ আইনের অধীনে বসবাস করা তার কর্তব্য। ধর্মীয় জ্ঞান কম থাকায় শাকিল তার কথাগুলো বিশ্বাস করেন। এরপর 
তাকে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয় এবং সেখানে থাকা নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করানো হয়।

এই জীবন তাকে ‘নতুন শুরু’ বলে মনে হয়েছিল। তিনি ভাবেন, সেখানে শান্তি, নিরাপত্তা ও নিজের মতো মানুষ পাবেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে, তিনি ছেলে নিয়ে তুরস্কে যাওয়ার টিকেট কাটেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, তখন তিনি দুর্বল ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। তুরস্ক থেকে তিনি সিরিয়ায় প্রবেশ করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি বাস্তবতা বুঝতে পারেন এটি কোনো স্বপ্ন নয়। কিছুদিনের মধ্যেই সংবাদপত্রে নিজের ছবি দেখে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি বড় সমস্যায় পড়েছেন।

সিরিয়ায় নারীরা একা থাকতে পারত না। তাকে অন্য নারীদের সঙ্গে একটি বাড়িতে রাখা হয়, যেখানে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হতো। জীবন ছিল সীমাবদ্ধ, নজরদারিতে ভরা এবং ভয়াবহ। পরে তাকে রাক্কায় নেওয়া হয়। সেখানে বোমা হামলার শব্দ, মৃত্যুর আশঙ্কা সবকিছু তাকে নাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বড় ভয় ছিল তার ছেলের জীবন। শেষ পর্যন্ত তিনি পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে, মাত্র তিন মাসের মধ্যে, নানা ঝুঁকি নিয়ে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে ফিরে আসেন।

যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার পরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার ছেলে আলাদা করে রাখা হয়। পরে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে তিনি নিজের জীবন নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। তিনি থেরাপি, পুনর্বাসন এবং ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত হন। একজন ইমামের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন, ইসলামিক স্টেটের কর্মকাণ্ড ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী।

২০১৯ সালে আইএসের পতনের পর শামিমা বেগমের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। শাকিল মনে করেন, কম বয়সে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষদের বিচার করার ক্ষেত্রে জটিলতা আছে, যদিও তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে আলাদা বলে মনে করেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর তার ওপর কঠোর নজরদারি ছিল। ছেলের সঙ্গে যোগাযোগও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। তবু তিনি নতুন করে জীবন শুরু করেন বিভিন্ন কাজে জড়ান এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন।

অন্যরা যেখানে চুপ থাকত, সেখানে তিনি নিজের গল্প বলতে চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, অনেকেই এসব ঘটনাকে শুধুই ‘খারাপ কাজ’ হিসেবে দেখে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার ফল। ধীরে ধীরে তিনি নিজের জীবন গুছিয়ে নেন ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, বন্ধু, স্থায়ী কাজ সব মিলিয়ে তিনি এমন জায়গায় পৌঁছান, যা একসময় অসম্ভব মনে হতো।

এরপর তিনি সামাজিকমাধ্যমে সক্রিয় হন। টিকটকে তিনি আত্মসম্মান, সম্পর্ক এবং জীবনের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, মানুষ প্রথমে তাকে তার অতীত দিয়ে চিনে, কিন্তু এখন তিনি কী করছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চান মানুষ আশাবাদী হোক। তা সে কারাগার থেকে বের হওয়া কেউ হোক বা সম্পর্কের কষ্টে থাকা কেউ। তার নিজের জীবনই প্রমাণ যে পরিবর্তন সম্ভব।

তবু তিনি বলেন, সিরিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত কখনোই ঠিক ছিল না এবং এর জন্য তিনি সারাজীবন অনুতপ্ত থাকবেন। তবে যদি সেই অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যদের সাহায্য করা যায়, তা হলে হয়তো তার একটি অর্থ তৈরি হয়। এখনও তিনি পুলিশের নজরদারিতে আছেন এবং ২০৩৪ সাল পর্যন্ত তা চলবে। কিন্তু তিনি আর কারও ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চান না। তার নিজের কথায় তিনি নিজেই এখন নিজের জন্য যথেষ্ট।



  বিষয়:   তারিনা  শাকিল  সন্ত্রাসবাদ  ব্রিটিশ  নারী  ইনফ্লুয়েন্সার  আইএস 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: