মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ‘কার্যত শেষ’ হতে যাচ্ছে

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মালিহা লোদি ৯/১১-এর সময় যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগত সুসম্পর্কই ইসলামাবাদকে

2026-04-13T02:02:16+00:00
2026-04-13T02:02:16+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
সাক্ষাৎকারে মালিহা লোদি
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ‘কার্যত শেষ’ হতে যাচ্ছে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ২:০২ এএম 
মালিহা লোদি। ছবি : সংগৃহীত
মালিহা লোদি ৯/১১-এর সময় যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগত সুসম্পর্কই ইসলামাবাদকে এই অঞ্চলের একমাত্র কার্যকর ‘শান্তি মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার কাছে এই সপ্তাহের আলোচনার গুরুত্ব আরও ব্যাপক; কারণ এটি বিশ্ব রাজনীতিতে ‘মধ্যম শক্তি’র দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ। মেশাল হোসেন শো পডকাস্টের জন্য নেওয়া এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো :

প্রশ্ন : পর্দার আড়ালে এমন কী ঘটছিল যা এই আলোচনাকে সম্ভব করল?

মালিহা লোদি : পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব উভয়ই টেলিফোনে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। আমি যতটুকু শুনেছি, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান [ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির] বিশেষ করে চুক্তি হওয়ার আগের শেষ কয়েক দিন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগে ছিলেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী [শেহবাজ শরিফ] নিয়মিত কথা বলছিলেন ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে। পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত প্রতিকূল মনে হচ্ছিল- বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন কড়া মন্তব্য শুরু করলেন, তখনও তারা হাল ছাড়েননি। ওই সময় এটা স্পষ্ট ছিল না যে, ট্রাম্পের সেই ‘একটি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার’ মতো হুমকিগুলো কেবলই বাগাড়ম্বর না কি এমন কিছু- যা ইরানিদের এতটাই ক্ষুব্ধ করবে যে তারা সবকিছু ভেস্তে দেবে।


আসিম মুনির ও ট্রাম্পের মধ্যে এই ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক তৈরি হলো কীভাবে?
এই ব্যক্তিগত সম্পর্কটি তৈরি হয়েছিল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের একেবারে শুরুতে, যখন পাকিস্তান তাকে একটি ‘আর্লি উইন’ বা প্রাথমিক সাফল্য উপহার দিয়েছিল। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সময় কাবুল বিমানবন্দরে বোমা হামলার জন্য দায়ী এক সন্ত্রাসীকে পাকিস্তান গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়। ট্রাম্প এই পদক্ষেপে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি কংগ্রেসে তার প্রথম ভাষণে এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। 

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাত প্রশমনে ট্রাম্প যখন ভূমিকা রাখেন, তখন পাকিস্তানের নেতারা বারবার তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকেন। এরপর ট্রাম্পের নাম ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের’ জন্য প্রস্তাব করা- ব্যক্তিগতভাবে আমি যার সমালোচক ছিলাম- তা ট্রাম্পকে খুশি করতে কাজ করেছিল। ট্রাম্প পাকিস্তানি নেতৃত্বের, বিশেষ করে মুনিরের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। 


কিন্তু তোষামোদির এই মাত্রা তো অনেক পাকিস্তানিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে...
হ্যাঁ, অবশ্যই। সেখানে কিছু বিশেষ সুবিধাজনক ব্যবসায়িক চুক্তিও ছিল। পাকিস্তান তাদের দেশে ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’ বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের জন্য ট্রাম্পের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ট্রাম্পের এজেন্ডায় শীর্ষে ছিল। এসব কিছুই পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করেছে। 

ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও তো অনেক সময় জটিল ছিল। ২০২৪ সালে একে অপরের মাটিতে আপনারা হামলাও চালিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অনেক চড়াই-উতরাই আছে। ২০২৪ সালের সেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দুই দেশই সম্পর্ক মেরামতের সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বছর [১২ দিনের যুদ্ধের সময়] পাকিস্তান ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সব মুসলিম দেশের মধ্যে পাকিস্তানই সম্ভবত ইরানের প্রতি সংহতি প্রকাশে সবচেয়ে সরব ছিল, যার জন্য ইরানি নেতারা প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জানান। এরপর লারিজানিসহ (যিনি পরে নিহত হন) অনেক ইরানি নেতার পাকিস্তান সফর এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।


ইরান খুব উচ্চাভিলাষী দাবি নিয়ে আলোচনায় গেছে, অন্যদিকে ট্রাম্প বলছেন সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে...
উভয় পক্ষই এখন এমন একটি আখ্যান (ন্যারেটিভ) তৈরি করেছে যেখানে তারা নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারে। আমি মনে করি উভয় পক্ষই জানে তাদের শর্তগুলো চরমপন্থি। প্রশ্ন হলো তারা কোনো সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে কি না। ওমান যখন মধ্যস্থতা করছিল তখন তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তাই হয়তো তারা আবারও সেই ধরনের কোনো চুক্তিতে ফিরে যেতে পারে। তবে এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে ‘হরমুজ প্রণালি’। ট্রাম্প এখন বলছেন তিনি ইরানের সঙ্গে মিলে এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতে চান। অন্যদিকে ইরান ওমানকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে রাজি হলেও অন্য কাউকে সেখানে দেখতে চায় না। ইরান বলছে, এতদিন সবাই বিনামূল্যে যাতায়াত করেছে, এখন থেকে তারা সমুদ্রপথে যাতায়াতের জন্য মাশুল (ঋববং) নেবে- এটি একটি চরম অবস্থান।


লেবানন নিয়েও তো মতভেদ আছে?
আমরা জানি লেবানন নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। শেহবাজ শরিফ বলেছেন লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অংশ, কিন্তু ইসরাইল বলছে এটি তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো ইসরাইল কি এই যুদ্ধবিরতি নস্যাৎ করবে? যদি ইসরাইল হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের অক্ষমতাকে তুলে ধরে, তবে আমরা খুব চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মুখোমুখি হব।
(দ্রষ্টব্য : এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের পরপরই লেবাননে ইসরাইলের বড় হামলার খবর আসে যেখানে ২০৩ জন নিহত হন।)


এই প্রক্রিয়ার সাফল্যের সম্ভাবনা কতটুকু?
আমি আশাবাদী হতে চাই। উভয় পক্ষই জানে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়া মানেই সবার জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এখন দুপক্ষই ‘বিজয়’ দাবি করার সুযোগ পাচ্ছে, যা যুদ্ধ শুরু হলে তারা হারাবে। এটিই চুক্তির জন্য বড় অনুপ্রেরণা। তারা প্রতি সাত মাস অন্তর যুদ্ধে জড়াতে পারে না; এর ব্যয় অনেক বেশি।


আমেরিকা কি হরমুজ প্রণালির বিষয়টি নিয়ে আগে ভাবেনি?
লোদি : একদমই তাই। আমেরিকানরা বেশ কিছু ভুল হিসাব করেছিল, এটি ছিল তার মধ্যে অন্যতম। অন্যটি ছিল এই ধারণা যে- ইরানের শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বহীন করলে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র জাতীয়তাবাদের শক্তিকে খাটো করে দেখেছে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো ইরানেও তারা একই ভুল করেছে। তারা ভেবেছিল হামলা করলে সরকারের বিরোধীরা জেগে উঠবে, কিন্তু যুদ্ধের প্রভাব হয়েছে উল্টো। মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।


৯/১১ পরবর্তী অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল কোথায়?
৯/১১-এর শুরুতে আমাদের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকানদের বলেছিলেন, আফগানিস্তান দখল করতে যেও না। সামরিক অভিযান হতে হবে সংক্ষিপ্ত এবং সূক্ষ্ম। দখলদার বাহিনী হওয়া যাবে না। কারণ আমরা জানি এ অঞ্চলের মানুষ বাইরের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজের দেশের গর্ববোধ বোঝে কিন্তু অন্য দেশের মানুষেরও যে সমান আত্মমর্যাদা আছে, তা তারা বুঝতে চায় না।

বিশ্ব ব্যবস্থায় কি বড় কোনো পরিবর্তন আসছে? 
আশা করি এবারের শিক্ষাটা হবে এই যে- সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় কাক্সিক্ষত ফলাফল দেয় না। আমরা এখন একটি বহুমুখী বিশ্বের দিকে যাচ্ছি যেখানে আমেরিকার একক আধিপত্যের যুগ মূলত শেষ। এটি পাকিস্তানের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোর গুরুত্বও তুলে ধরেছে, যারা এখন ভূ-রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারছে।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   মধ্যপ্রাচ্য  মার্কিন আধিপত্য  সাক্ষাৎকার  মালিহা লোদি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: