স্পন্সর সংকটে বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনে এখন বেহাল দশা। বিগত কমিটির রেখে যাওয়া প্রায় ৪ কোটি টাকার বর্তমানে অবশিষ্ট আছে ১ কোটির একটু বেশি। অনেকের মতে, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, অনভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠকদের দায়িত্ব অবহেলার কারণে নাকি ফেডারেশনের এই বেহাল দশা।
সভাপতির ফেডারেশন নিয়ে উদাসীনতাও এর অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। গত বছর এক কাভা ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা দায়িত্বহীনতার কারণে খোয়া গেছে বলে অভিযোগ। তবে বোমা ফাটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভলিবলের সাবেক অধিনায়ক সাঈদ আল জাবীর রাজেশ লিখেছেন, আগের ফেডারেশনের রেখে যাওয়া ৪ কোটি টাকার বর্তমানে ১ কোটির কিছু বেশি টাকা ফান্ডে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজেশ এটিও অভিযোগ করে লেখেন যে, এর পেছনে সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকা রয়েছে। যদিও ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক বিমল ঘোষ ভুলু এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ভলিবল ফেডারেশনের তহবিলের অব্যবস্থাপনার কথা বেশ কয়েক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে! ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকুর কাছ থেকেও এমন তথ্য এসেছে। ২৩ বছরের বেশি সময় ভলিবল ফেডারেশনে সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন নড়াইলের এ অভিজ্ঞ সংগঠক।
২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব ছেড়ে দেন মিকু এবং তার কমিটি। পরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার গঠিত সার্চ কমিটি ভলিবলে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। সেখানে আশিকুর রহমান মিকুর স্থলাভিষিক্ত হন এক সময়কার ভলিবল খেলোয়াড়-অধিনায়ক বিমল ঘোষ ভুলু।
মিকুর কমিটির রেখে যাওয়া বিপুল অর্থ তা হলে কোথায় গেল- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সময়ের আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক বিমল ঘোষ ভুলুর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘চার কোটি টাকা নয়। ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যাংকে এফডিআর। আর ৬০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা নগদ অর্থ রেখে যায় বিগত কমিটি। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন কোটির কিছু বেশি। আমরা কোনো তহবিল তছরুপ করিনি। খেলা পরিচালনা করতে গিয়েই কিছু অর্থ ব্যয় হয়েছে। তহবিলে এখনও দেড় কোটি টাকার মতো আছে। মেয়েদের জন্য ৫০ লাখ টাকা আসার কথা। সেটি যোগ হলে ২ কোটি রান করবে।’
ভুলু আর যোগ করেন, ‘আমরা এক বছর চার মাস হলো দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা তো কিছু কার্যক্রম করেছি, সেটির কী খরচ হয়েছে না হয়েছে সেগুলো যদি সরেজমিন এসে পর্যালোচনা করে, তা হলেই বুঝতে পারবে যে আমরা টাকা কি পকেটে করে নিয়ে গেছি, নাকি না এগুলো খরচ হয়েছে এবং কোন পারপাসে খরচ হয়েছে বিস্তারিত জানানো হবে। এমন না যে, কোনো জিনিস হাইড করা হবে। আমরা যেহেতু সরকারি অনুদান পাইনি বা পৃষ্ঠপোষক ওরকম ছিল না। আমাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট কিছু পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এর বাইরে আমরা কোনো স্পন্সর পাইনি।
ভুলু একেবারে মিথ্যা বলেননি। গত এক বছরে তার কমিটির অধীনে ঘরের মাঠে বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক আসর আয়োজন, ঘরোয়া লিগ-টুর্নামেন্ট, তারুণ্যের উৎসব আয়োজন, মালদ্বীপে মেয়ে ভলিবল দল পাঠানো- তাদের মাধ্যমে ব্রোঞ্জ পদক জেতা, খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফি বৃদ্ধি সবচেয়ে বড় খরচের খাত হিসেবে এসএ গেমসের চার মাসের ট্রেনিং (ছেলেমেয়ে টিম) ক্যাম্পের কথাও উল্লেখ করেন ভলিবল ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক।
যেহেতু পর্যাপ্ত স্পন্সর এ সময়ে আসেনি, অগত্যা ফান্ড থেকে টাকা কিছু খরচ হয়েছে বলে সময়ের আলোকে নিশ্চিত করেন ভুলু। ২০২৪-২৫ সালের অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের অডিটের হিসাব ফেডারেশনের হাতে রয়েছে। যেহেতু একটা অভিযোগ এসেছে, সেহেতু চলতি বছরের হিসাবটাও ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে অডিট করা হবে বলে সময়ের আলোকে নিশ্চিত করেন ফেডারেশনের এ কর্তা।
তা হলে তহবিল অব্যবস্থাপনা যে অভিযোগ সেটি কি ভিত্তিহীন- এ ব্যাপারে ভুলু বলেন, ‘ভিত্তিহীন কি না সেটি কাগজেই আপনারা দেখতে পারবেন। এটি আমি বলে তো লাভ নেই মুখ দিয়ে। আমি তো বলব যে আমি ভালো, একদম ভালো, দুধে ধোয়া মানুষ তাই না?
কিন্তু আমি বলব যে, যেটি নাকি আমার একচুয়াল খরচ হয়েছে সে খরচটাই আপনাদের সামনে তুলে ধরব।’ ফান্ড ভাঙার বিষয়ে জানতে ফেডারেশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ লতিফ শাহরিয়ার জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বেশ কয়েকবার ফোন/মেসেস দেওয়ার পরও ওনি প্রতিউত্তর দেননি।
ফেডারেশনের তহবিলের বিষয়ে সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকু বলেন, ‘আমি দায়িত্ব ছাড়ার আগে তাদের হাতে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। তারা কিন্তু আমাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বিদায়ি সংবর্ধনা দিয়েছেন। আমি বলব, খরচ যাই হয়েছে, তাদের ফান্ড অর্থাৎ ব্যাংকের এফডিআর ভাঙা ঠিক হয়নি। অতীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। আমরা অল্প অল্প সঞ্চয়ে এ অর্থ ফেডারেশনের জন্য রেখে এসেছিলাম। আমরাও খরচ করেছি।
কিন্তু এত খরচ একসঙ্গে হয়নি। শুনেছি ঘরের মাঠে সাউথ এশিয়ান সেন্ট্রাল জোন আয়োজনেও তারা অধিক অর্থ খরচ করেছেন। আমরা আগেও এই আসরে অংশ নিয়েছি, আয়োজনে ছিলাম। রাজেশ আমার কাছে হিসাবের খরচটা চেয়েছিল। আমি তাকে সেটি সেন্ড করেছি। এখন সে কি করেছে, ফেসবুকে পোস্ট করেছে কি না এটি আমার জানা নেই। আমি আবারও বলব, আমরা খরচ করলে টাকা হিসাব করে আবার ফান্ডে রেখে দিতাম। কিন্তু এক বছরে একসঙ্গে এত টাকা কখনো খরচ হয়নি।’
সময়ের আলো/কেএইচও