ইরান যুদ্ধের ইতি টানতে বাকি থাকা মতপার্থক্যগুলো ঘুচিয়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আগামী দিনগুলোতে পাকিস্তান, মিসর এবং তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবেন। আঞ্চলিক একটি সূত্র ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই এখনও বিশ্বাস করে যে, একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। মধ্যস্থতাকারীদের আশা, মতপার্থক্য কমিয়ে আনতে পারলে ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আলোচনার আরেকটি ধাপ শুরু করা যেতে পারে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরান যদি তাদের পথ পরিবর্তন না করে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনরায় হামলা চালানোর কথা ভাবছেন। লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় এমন সব অবকাঠামো থাকতে পারে, যা যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ট্রাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানে আলোচনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তের মতোই এই অবরোধও চলমান দরকষাকষির অংশ। ওই কর্মকর্তার দাবি, ট্রাম্প চান না ইরান আলোচনার টেবিলে হরমুজ প্রণালিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করুক। আঞ্চলিক সূত্রটি জানায়, আমরা পুরোপুরি অচলাবস্থায় নেই। দরজা এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি। উভয়পক্ষই দরকষাকষি করছে। এটি অনেকটা বাজারের মতো। মার্কিন এক কর্মকর্তা এই মন্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে যোগ করেন, ইরান যদি আরও নমনীয়তা দেখায় এবং এটা বুঝতে পারে যে ইসলামাবাদ প্রস্তাবই তাদের জন্য সেরা সুযোগ, তবেই চুক্তি সম্ভব।
অন্যদিকে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান মোহসেনি ইজেই জানিয়েছেন, তার দেশ নীতি এবং যুক্তির ভিত্তিতে যেকোনো আলোচনা এবং সমঝোতার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সোমবার বিচার বিভাগের সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইজেই বর্তমান পরিস্থিতি এবং শত্রুপক্ষের ব্যর্থতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, মার্কিনিরা তাদের চিরচেনা অহংকার নিয়ে ইসলামাবাদ আলোচনায় অংশ নিয়েছিল এবং যুদ্ধের ময়দানে যা তারা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে আদায়ের চেষ্টা করেছিল। তবে ইরানের প্রতিনিধি দল অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষা করেছে এবং মার্কিনিরা যেভাবে ৪০ দিনের যুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি আলোচনার টেবিলেও তাদের হার হয়েছে।
ইজেই স্পষ্ট করে বলেন, আলোচনা বা সমঝোতা হতে হবে সম্মানজনক এবং যৌক্তিক। কোনো ভুল বা অন্যায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ইরান বরদাশত করবে না। তিনি মনে করেন, তৃতীয় দফা চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের অর্জনগুলো রক্ষা করা এখন পুরো ইরানি জাতির প্রধান দায়িত্ব। দেশটির কূটনীতিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এবং বিচার বিভাগের প্রতিটি কর্মীকে সাহসী সৈনিকদের ত্যাগের কথা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।
ইরানের প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, গোটা জাতি এখন সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ মেনে ঐক্যবদ্ধ আছে এবং তারা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও ইরানি যোদ্ধাদের হাত এখনও বন্দুকের ট্রিগারেই আছে এবং তারা মোটেও শিথিল হয়ে পড়েনি। ইসরাইল বা অন্য কোনো শত্রু ইরানি জাতির একতা ভাঙতে পারবে না। তিনি বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যেন তারা দেশদ্রোহী এবং শত্রুর সহযোগীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখেন। আদালতের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সবাইকে যুদ্ধের প্রস্তুতির মতো তৎপর থাকতে হবে যেন ইরানের সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আবারও মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ইরান সবসময় শান্তি চায়, তবে সেই শান্তি হতে হবে ন্যায়ের ভিত্তিতে।
অন্যদিকে আলোচনায় অংশ নেওয়া পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম এক্সে লিখেছেন, ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হয়নি বরং এটি একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, যদি আস্থা ও সদিচ্ছা জোরালো হয়, তবে সব পক্ষের স্বার্থরক্ষা করে একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। মার্কিন কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল পরমাণু ইস্যু। একটি বড় মতপার্থক্য ছিল ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করা এবং তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি নিয়ে। সূত্রগুলো জানায়, অন্য আরেকটি বিরোধের জায়গা ছিল- পারমাণবিক ছাড়ের বিনিময়ে ইরান কী পরিমাণ অর্থ অবমুক্ত করতে চায়, তা নিয়ে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘লক্ষ্য পরিবর্তন’ করার আগে পক্ষগুলো চুক্তির একদম কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও মার্কিন কর্মকর্তা এবং আঞ্চলিক সূত্রগুলো এই দাবি নিশ্চিত করেনি, তবে তারা অগ্রগতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গত রোববার তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে ফোনে কথা বলেন। এরপর তারা দুজনেই হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ এবং আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে প্রথমবারের মতো ইরানিদের সঙ্গে দেখা করেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা এই আলোচনাকে ‘কঠিন’ বলে অভিহিত করলেও পরবর্তী সময়ে একে ‘প্রস্তাব আদান-প্রদানের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বিনিময়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইসলামাবাদ আলোচনার সমাপ্তি কিছুটা নিরানন্দ হলেও ভ্যান্স আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন এবং আশা করছেন ইরান পুনরায় টেবিলে ফিরবে। ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট আশাবাদী যে, আগামী দিনগুলোতে ইরান তাদের দেওয়া প্রস্তাবটি নিয়ে ভাববে এবং বুঝতে পারবে যে চুক্তি হওয়া উভয়পক্ষের স্বার্থেই মঙ্গলজনক।
সময়ের আলো/আআ