মাত্র তিন দিন আগেও যার কণ্ঠে ছিল সুর। যিনি প্রাণান্তকর চেষ্টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে সুর তুলে নিয়েছিলেন তার কণ্ঠে, তিনি হলেন ভারতীয় সংগীত জগতের কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলে। এক বছর আগে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন মুম্বাইয়ের একটি মিডিয়াতে।
সেই মিডিয়ার সামনে অকপটে জানিয়েছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্তটিও তিনি কাটাতে চান গানের মধ্যে। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার একটাই ইচ্ছা, গাইতে গাইতে যেন চলে যাই। গানই আমার জীবন।’
১২ এপ্রিল মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস করার এক মুহূর্ত আগে ভারতীয় সংগীত জগতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে তাই করেছিলেন। যা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া সেই ছবি প্রকাশ করেছে।
সুরের জগতে যার অবদান অমূল্য। সবাই বলে, আশা ছিল, আশা নেই তা ভাবতে পারি না। এরপরও বলতে হয়, এ যেন সুরের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। কালের যাত্রায় এক সুরসাধকের বিস্ময়কর যাত্রা থেমে গেল। যিনি হিন্দি, বাংলাসহ অন্যান্য ভাষা মিলে প্রায় কয়েক হাজার গানের সমাহার।
ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতে তিনি বড় ব্যানারের ছবির নিয়মিত মুখ ছিলেন না। বরং তাকে বারবার জায়গা করে নিতে হয়েছে প্রান্তিক প্রযোজনার ভেতর দিয়ে। যেখানে সুযোগ কম, প্রতিযোগিতা বেশি। আর স্বীকৃতি তো প্রায় অনিশ্চিত। সেই অনিশ্চয়তার ভেতরেই তিনি নিজের কণ্ঠকে গড়ে তুলেছিলেন আলাদা পরিচয়ে। যা ধীরে ধীরে তাকে টেনে আনে মূলধারা আলোতে। ‘ইয়েহ মেরা দিল’, ‘দম মারো দম’ ইত্যাদি গান দিয়ে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।
বড় বোন আরেক কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকর। কিন্তু বড় বোনের মতো তিনি কেন কণ্ঠ ধারণ করতে পারলেন না? এই প্রশ্নে তিনি সরাসরি উত্তর দিয়েছেন। বলেছেন, যদি কণ্ঠ আলাদা করতে না পারতাম হয়তো আমি সংগীত জগতে টিকে থাকতে পারতাম না। তিনি নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন, কণ্ঠ ক্যারিকচারের জন্য রিহার্সেল করেছেন। আর সে পথটি সুগম করে দেন ভারতের বিখ্যাত সংগীত পরিচালক, সুরকার ও গীতিকার ওপি নাইয়ার।
কিংবদন্তি গীতিকার ও সংগীত পরিচালক ওপি নাইয়ারের আশা ভোঁসলের সম্পর্ক ছিল সংগীত ইতিহাসের এক আলাদা অধ্যায়। ওপি নাইয়ার কখনো লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাজ করতেন না। কেন করতেন না তা অনেকের কাছে রহস্য মনে হয়েছে। তবে লতার সেই শূন্য জায়গাটাই আশা ভোঁসলের জন্য খুলে দেয় নতুন দরজা। এই সহযোগিতা যেন তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাকে নিয়ে যায় এক ভিন্ন ধাঁচের কণ্ঠশিল্পীর উচ্চতায়।
আবার রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু সংগীত জগৎ নয়। এক ধরনের অনুভূতি নিয়ে দুজনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। যা সংগীত জগতে আলোচনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে উমরাও জান চলচ্চিত্রে তার গাওয়া গজল যেন তাকে আবিষ্কারের দরজা খুলে দেয়। যে কণ্ঠকে আগে অনেকেই চঞ্চল ও আধুনিক ঘরানার প্রতীক হিসেবে দেখতেন, সেই কণ্ঠই হঠাৎ হয়ে উঠে গভীর, সংবেদনশীল আর শাস্ত্রীয় আবেগে ভরপুর এক অন্য সত্তা। আশা ভোঁসলের এই রূপান্তর শুধু তাকে প্রশংসা এনে দেয়নি। এনে দিয়েছিল নতুন করে মূল্যায়নের এক জায়গা।
আশা ভোঁসলের আলোচিত গান ‘দম মারো দম’। এটি ব্যবহার হয়েছিল ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’। গানটি মুক্তির পাওয়ার পরপরই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও বিষয়বস্তু নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। গানটিতে মাদক ব্যবহারের ইঙ্গিত ও কিছু শব্দ চয়নে ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী হিসেবে আখ্যা দিয়ে এটি অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শনে সম্প্রচারে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে বিতর্ক থামাতে পারেনি।
মজার বিষয়, যে গানটি একসময় নিষিদ্ধ হয়েছিল, সেই গানেই আশা ভোঁসলে জিতে নেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। এই গানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ছবির পরিচালক দেব আনন্দ প্রথমে গানটি সিনেমা থেকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আশা ভোঁসলের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত গানটি রাখা হয়। আর সেটিই হয়ে ওঠে ছবির সবচেয়ে স্মরণীয় অংশ। ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গানটির কথা লিখেছিলেন আনন্দ বক্সী আর সুর দিয়েছিলেন আর ডি বর্মণ।
মারাঠি হয়ে কীভাবে অন্য ভাষা রপ্ত করবেন সে চেষ্টা ছিল অনবরত। আশা ভোঁসলে কলকাতা এলেন যখন তখন তিনি একদমই বাংলা বলতে পারতেন না। সংগীত পরিচালক ভি বালসারা আর গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় আশা ভোঁসলেকে বাংলা গান শেখাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তবে আশা ক্লান্ত হননি। তিনি তো নাছোড়বান্দা। তিনি বাংলা ঠিক শিখবেনই। সেই প্রথম বাংলা গান গাইলেন। তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস।
গান তোলা শেষ হলে আশা ভোঁসলের আবদার তিনি সুরকার, গীতিকারের সঙ্গে চৌরঙ্গীতে হাঁটতে বের হবেন। হাঁটতে হাঁটতে উঠলেন গ্র্যান্ড হোটেলে। হোটেলে ফিরে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আশা জিগ্যেস করলেন, সুধীন দাশগুপ্ত নামের এক ভদ্রলোক কেমন সুর করেন? পুলকবাবু বললেন, ও আমার বন্ধু। খুব ভালো সুর করে। আশা তখন জানালেন, তিনি আমাকে বাংলা আধুনিক গান গাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমি বাংলা গান করতে চাই। এরপর সুধীন দাশগুপ্তের সুরে প্রথম আধুনিক বাংলা গান গাইলেন আশা ভোঁসলে। দুটি গান রেকর্ডের দুই পিঠে। এক পিঠে হচ্ছে ‘নাচ ময়ূরী নাচ রে’। অন্য পিঠে হচ্ছে, ‘আকাশে আজ রঙের মেলা’। এ দুটি গানের কথা লিখেছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তখন মুম্বাইয়ে লতা মঙ্গেশকরের রমরমা অবস্থা। বাংলা গানেও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী আর সতীনাথ মুখোপাধ্যয়ের সুরে লতা হিট। লতার থেকে আলাদা গায়কি তৈরি করতেই গীতা দত্তের ঢঙে গাইতে শুরু করলেন আশা ভোঁসলে। একসময় গীতার বিকল্প হয়ে উঠলেন আশা ভোঁসলে। গান নিয়ে লতার যুগে আশা ভোঁসলের এ যেন এক কঠিন অন্তর্যাত্রা। মান্নার দের সুরে গাইলেন, ‘আমি খাতার পাতায় চেয়েছিলাম তোমার সই গো’। মিষ্টি সুরে আশা ভোঁসলের এসব গান তখন মন ভরা তো রেডিওর অনুরোধের আসরে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তার সুরে আশা ভোঁসলেকে দিয়ে খুব বেশি না গাওয়ালেও ‘মন নিয়ে’ ছবিতে দারুণ গান গাইয়েছিলেন। ‘দীপ জে¦লে ওই তারা এ কী কথা বলে যায়’ আশার কণ্ঠে এ গান যেন ভিন্ন মাদকতা তৈরি করে।
রবীন্দ্রসংগীতের আশার প্লেব্যাক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই। বাংলা গানের ব্যাপারে আশা ভোঁসলের নিজের মন্তব্য হচ্ছে, আমি চেষ্টা করি বাংলা ভাষা শেখার। ছোটবেলায় সংস্কৃতি পড়াশোনা করেছি। তবে উর্দু, হিন্দি, স্প্যানিস ভাষা শিখেছি। রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গে বলেছেন, আমাকে রবীন্দ্রসংগীত টানে। তিনি বেশ কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীতের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘চোখে আমার তৃষ্ণা, আমার মন মানে না দিনরজনী।’
এ কথা অনেকের অজানা নয়, তিনি ভারতের বিখ্যাত সংগীত পরিচালক ছাড়াও বয় জর্জ, ক্রোনোস কোয়র্টেট ও মাইকেল স্টাইপের মতো শিল্পীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোলাবরেশনে কাজ করেছেন। এই উপমহাদেশে এ ধরনের উদাহরণ বিরল। তার সবশেষ কাজ ছিল, ব্রিটিশ ভার্চুয়াল ব্যান্ড গরিলাজের সঙ্গে ‘দ্য মাউন্টেন’। মেধায়-মননে আর ভাবনায় কতটা আধুনিক হলে এত বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজ করা সম্ভব।
সবশেষ ভারতীয় এক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আশা ভোঁসলে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তারই কিছু চুম্বক অংশ উল্লেখ করা হচ্ছে। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কেন পাশ্চাত্যের সুরের দিকে ঝুঁকলেন? তিনি বলেছেন, আমি ছোটবেলায় প্রচুর ইংরেজি ছবি দেখতাম। সেই সব গানের সুর কিংবা আবহসংগীত আমাকে টানত। তবে আমি যে হুবহু পাশ্চাত্যের অনুকরণ করি তা নয়। সেখান থেকে অনুপ্রেরণা পাই। আমার স্টাইলে ভিন্নতা থাকতে হবে।
কতক্ষণ তিনি গানের প্র্যাকটিস করেন এই প্রশ্নে তিনি বলেন, রেওয়াজ ছাড়া কণ্ঠ ঠিক রাখা সম্ভব নয়। যে কারণে বয়সের শেষ প্রান্তে এসেও গান গাইতে পারছি। তবে শারীরিক অবস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কতদিন গান গাইবেন? এই প্রশ্নে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন, যতক্ষণ কণ্ঠ আছে ততক্ষণ গান গাইব। জেনারেশন গ্যাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে আকর্ষণ করছেন? তিনি আবারও বললেন, ওপরওয়ালার আশীর্বাদ।
তবে হ্যাঁ নতুন জেনারেশনের চাহিদা কী তা বুঝতে হবে। তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পৃথিবী এখন ফাস্ট হয়ে গেছে। শ্রোতাদের রুচি এর সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে। তবে জেনারেশন গ্যাপ দূর করা প্রয়োজন।
গ্রামোফোন থেকে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু আশা ভোঁসলে এমনই এক নাম, যিনি সব মাধ্যমেই ছিলেন প্রাসঙ্গিক। আট দশকের বেশি সময় ধরে সংগীত জগতে রাজত্ব করা মোটেই সহজ কাজ নয়। কিন্তু বহুমুখী কণ্ঠের অধিকারী আশা ভোঁসলের পক্ষে তা সম্ভব হয়েছে। সুরের সঙ্গে নিজের কণ্ঠকে সংগত করার আকুতি ছিল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পৃথিবীর সব ধরনের মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে আমি গান গাইতে চাই। আমার কাছে প্রজন্ম ভেদে কোনো গানের কোনো বিভাজন নেই। বরং কালকের তরুণ মিউজিশিয়ান এই পৃথিবীর নতুন সুরের সঙ্গে যে সংযুক্তি তৈরি করেছে তা থেকে আমিও শিখতে চাই।
সুরের পৃথিবীতে কিছু নাম থাকে, যারা শুধু গান গেয়ে থেমে যান না। তারা সময়ের ভেতরে গল্প লিখে যান। স্মৃতির ভেতরে আলোছায়া এঁকে যান। ভারতীয় সংগীতের সেই বিরল কণ্ঠশিল্পীদের একজন আশা ভোঁসলে। তার জীবন মানে শুধু মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে গান গাওয়া নয়। বরং এক দীর্ঘ যাত্রা। যেখানে আছে অনিশ্চয়তার কাঁটাবন। সম্পর্কের নীরব টানাপড়েন। সাফল্যের উজ্জ্বল আলো। আট দশকের বেশি সময় ধরে তার কণ্ঠ বদলেছে সময়ের সঙ্গে। তেমনি তার জীবনের গল্পও হয়ে উঠেছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক গসিপ। কিংবদন্তির মিশ্র ক্যানভাস।
সময়ের আলো/আআ