বাজারে প্যাকেটজাত যেসব খাদ্যপণ্য আছে সেগুলোকেও স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কতার আওতায় আনা হচ্ছে। প্যাকেটের সামনের দিকে বড় একটা অংশজুড়ে লেখা থাকতে হবে স্বাস্থ্য সতর্কতার বার্তা। এসব পণ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় যেসব উপকরণ থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর সেগুলো লেখা থাকতে হবে। সাধারণত প্যাকেটপণ্যে অতিরিক্ত মাত্রার চিনি, লবণ এবং চর্বি যুক্ত থাকে। তাই প্যাকেটের গায়ে সামনের দিকে লিখতে হবে- ‘অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।’
জানা গেছে, ইতিমধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা-২০২৬ প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া অংশিজনের মতামতও চাওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৬৪টি দেশি-বিদেশি সংস্থা তাদের মতামত দিয়েছে এ ব্যাপারে। এখন তাদের মতামত যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় মতামতগুলো প্রবিধানে সন্নিবেশ করা হবে। চলতি মাসেই এর ড্রাফট চূড়ান্ত করা হবে এবং রিভিউয়ের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত আইনের জন্য এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয় আইন চূড়ান্ত করে দিলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রজ্ঞাপন জারি করবে। প্রজ্ঞাপন জারির ৬ মাস পর এই নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর আওতায় এই বিধিমালা কার্যকর হবে। অথাৎ এই আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিড়ি-সিগারেটের মতো তামাকজাত পণ্যের মোড়কের গায়ে যেভাবে স্বাস্থ্য সতর্কতা লেখা থাকে, সেভাবে প্যাকেটজাত পণ্যের গায়েও স্বাস্থ্য সতর্কতা লেখা বাধ্যতা মূলক হবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বিএমএ মিলনায়তনে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবিটরের সহযোগিতায় এবং প্রজ্ঞা আয়োজিত কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়। ‘বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং : প্রয়োজনীয়তা, অগ্রগতি ও করণীয়’ শীর্ষক এই কর্মশালায় বক্তব্য রাখেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর মোহাম্মদ শোয়েব, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবিটরের বাংলাদেশ প্রধান মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের, বিডিনিউজ২৪-এর ক্রাইম চিফ লিটন হায়দার, প্রজ্ঞার হেড অব প্রোগ্রাম হাসান শাহরিয়ার প্রমুখ।
কর্মশালায় জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে অতি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস ক্রমশ বাড়ছে। ফলে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। দেশে প্রায় ১৩.৯ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে এবং ২৩.৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চরক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে ভুগছেন। ডব্লিউএইচও এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার ২৬৩ জন মানুষ মারা যায় বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ এবং যার ১৯ শতাংশই অকাল মৃত্যু। অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম), চিনি ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর একটি বড় অংশের জন্য দায়ী খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ, যা বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এই কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ভোক্তার স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে সরকারসমূহকে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পুষ্টি নীতি-নিউট্রিয়েন্ট প্রোফাইল মডেল বা এনপিএম গ্রহণের সুপারিশ করে; ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ-লেবেলিং বা এফওপিএল এই সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই গৃহীত হচ্ছে এই জনস্বাস্থ্য নীতি।
কর্মশালায় জানানো হয়, ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ-লেবেলিং (এফওপিএল) ব্যবস্থা হলো একটি খাদ্য-লেবেলিং ব্যবস্থা, যেখানে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয়ের প্যাকেট বা মোড়কের সামনের অংশে সহজ ভাষা, চিহ্ন বা সতর্কবার্তার মাধ্যমে পণ্যের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো পণ্যে চিনি, লবণ (সোডিয়াম), স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্স-ফ্যাটের মাত্রা বেশি কি না তা ভোক্তাকে দ্রুত ও সহজে বুঝতে এবং তুলনা করতে সহায়তা করা।
সাধারণভাবে প্যাকেটজাত খাবারে পুষ্টি তথ্য প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষর ও জটিল সংখ্যায় দেওয়া থাকে। সব ভোক্তার পক্ষে এগুলো পড়ে বোঝা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। এফওপিএল এই সীমাবদ্ধতা সহজে দূর করতে পারে। এটি ভোক্তার পছন্দ সীমিত করে না; বরং স্বচ্ছ তথ্য দিয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে। এ জন্য ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ-লেবেলিং (এফওপিএল) অবশ্যই একটি শক্তিশালী নিউট্রিয়েন্ট প্রোফাইল মডেলের (এনপিএম) ওপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা উচিত বলে মত দেন বক্তারা।
বাংলাদেশে এফওপিএল প্রয়োজনীয়তা কেন
এ বিষয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশে ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করেন। বিশেষ করে বিস্কুট, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও স্যুপ, স্ন্যাকস ও চিনিযুক্ত পানীয়।
আরেক গবেষণায় ৬৩ শতাংশ প্যাকেটজাত খাদ্যে উচ্চমাত্রায় লবণ (সোডিয়াম) পাওয়া গেছে। এ ছাড়া দেশে প্রচলিত ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার (চিপস, চানাচুর, ডাল ভাজা ও মটর ভাজা, নুডলস, বিস্কুট, লজেন্স-ললিপপ, মিল্ক চকোলেট, চাটনি, আইসক্রিম) পরীক্ষা করে দেখা গেছে, লবণ (সোডিয়াম), চিনি ও চর্বির মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দৈনিক নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রতি ১০০ গ্রাম বিস্কুট ও মিল্ক চকলেটে ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি। ১০০ গ্রাম লজেন্সে ৪৩ গ্রাম চিনি পাওয়া গেছে, যা নির্ধারিত ২৫ গ্রাম সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
১০০ গ্রাম ডাল ভাজায় ৬.১ গ্রাম লবণ (সোডিয়াম) পাওয়া গেছে, যা সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম সীমার চেয়ে অনেক বেশি। অন্যান্য খাবারেও এসব উপকরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি লক্ষ করা গেছে। এ ছাড়া, ৪৬ শতাংশ প্যাকেটে স্যাচুরেটেড ফ্যাট সম্পর্কিত তথ্য, ৩৮ শতাংশ প্যাকেটে ট্রান্সফ্যাট সম্পর্কিত তথ্য এবং ২১ শতাংশ প্যাকেটে চিনি ও লবণের তথ্য পাওয়া যায়নি এবং কোন প্যাকেটেই লবণ (সোডিয়াম), চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্সফ্যাটের সঠিক পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। এই বাস্তবতার আলোকেই প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ে স্বাস্থ্য সতর্কতা থাকা দরকার বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সময়ের আলো/আআ