বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বাড়ছে। পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করছে। বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে। যে কারণে গতকাল বুধবার তথ্য উপদেষ্টা এক ব্রিফিংয়ে হাম সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের বিস্তার, মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চলমান টিকাদান কর্মসূচির মধ্যে এ রোগের ভয়াবহতা থেমে নেই। শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে- বিগত দুই বছর টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া, অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এসব কারণ মিলিত হওয়ায় সংক্রমণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তারা দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্ত শিশুদের পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। দেশে গত এক মাসের মধ্যেই শিশুদের বেশি মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ২ জন। এ সময়ে নতুন করে ১৪শর বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ৩০ দিনে হামের কারণে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৮৬-তে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শিশুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নয়নকে হুমকিতে ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন- উচ্চ সংক্রমণের ঢেউ চলবে আরও কয়েক সপ্তাহ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, এর মূল কারণ হলো টিকাদান কার্যক্রমের কিছুটা অপ্রতুলতা ও সময়মতো টিকা না দেওয়া। যদিও সরকার দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে, তবে অনেক শিশুই এখনও টিকা পায়নি। অধিকাংশ আক্রান্ত শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে, যারা এখনও টিকা পায়নি বা পুরোপুরি টিকা সম্পন্ন করেনি। এর ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজন সঠিক ও ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালু করা, পাশাপাশি আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন শিশুদের সঠিকভাবে বিচ্ছিন্ন (আইসোলেশন) করা। পাশাপাশি পরিবারের সচেতনতাও অপরিহার্য। স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে এ সংকট উত্তরণ সম্ভব। শিশুরা যেন সুস্থ ও নিরাপদ থাকতে পারে, সে জন্য সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ১৭ হাজার ২৪ জনের শরীরে। আর এই সময় সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ৯৫৪ জন। আর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৭২১ জনের শরীরে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত হাম থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৮ হাজার ৩৬৯ জন।
হামের সংক্রমণ শুরুতে নতুন সরকার দ্রুত টিকাদান কর্মসূচিতে নতুন করে ৬০১ কোটি টাকা বরাদ্দ করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। যা সময়োপযোগী কার্যকর সিদ্ধান্ত।
মৌসুমি এই রোগের সংক্রমণ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে বেশি হয়, তবে এখন দেখা যাচ্ছে, উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বছরের যেকোনো সময়ই হামের প্রাদুর্ভাব হতে পারে। তাই বারবার সচেতনতা ও টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। সরকারের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব রয়েছে, যাতে হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সবাই সচেতন হন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
এই সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। স্বাস্থ্য বিভাগের দ্রুত কার্যক্রম, সমাজের সচেতনতা ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হলো এই পরিস্থিতির সমাধানের মূল চাবিকাঠি। সবাইকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে শিশুদের জীবন নিরাপদ ও সুস্থ রাখতে সহায়ক হয়। দেশ ও সমাজের স্বার্থে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সময়ের আলো/আআ