শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দিবাগত রাত থেকে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের হজ ফ্লাইট। বাংলাদেশ থেকে এবার ৭৮ হাজার ৫০০ জন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হজ পালনের লক্ষ্যে পবিত্র মক্কায় যাবেন। ইসলামে ‘হজ’ নামাজ-রোজার মতোই ফরজ ইবাদত। সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য জীবনে একবার হজ করা আবশ্যক। সৌদি আরবের মক্কায় নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে নানা আমলের মাধ্যমে হজ পালন করতে হয়। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এবার হজ অনুষ্ঠিত হবে ২৬ মে। হজ পালনের নিয়ম-কানুন ও করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ইসলাম বিভাগের প্রধান মুফতি আমিন ইকবাল।
পরিশুদ্ধ নিয়ত ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ
হজের সফরে বেরোনোর আগে নিয়ত শুদ্ধ করুন। লোক দেখানো কিংবা ‘হাজি’ ডাক শুনতে নয়, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হজে যাচ্ছেন- দৃঢ়তার সঙ্গে এই নিয়ত করুন। হজের আহকাম ও বিধানাবলি সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিন। হজ সফরে কোথায় কখন কী আমল করতে হবে, কোন আমল করা ফরজ, কোন আমল ওয়াজিব, কোন আমল সুন্নত ইত্যাদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখুন। হজের তালিবায়াসহ গুরুত্বপূর্ণ দোয়াগুলোও মুখস্থ করুন। যদিও হজ সফরে এজেন্সির পক্ষ থেকে মুয়াল্লিম বা হজ গাইড থাকার কথা। কিন্তু আপনি নিজেরটা নিজে করতে পারলে অন্যের অপেক্ষায় বসে থাকবেন কেন! তা ছাড়া এমনও হতে পারে উপস্থিত সময়ে আপনি মুয়াল্লিমকে খুঁজে পাচ্ছেন না, তখন যেন ঝামেলায় না পড়তে হয় কিংবা আপনার হজের কাজ অসম্পূর্ণ না থাকে, তাই আপনার আশপাশে কোথায় হজ প্রশিক্ষণ চলছে সেখানে যোগাযোগ করে আজই হজের মাসআলাগুলো ভালোভাবে জেনে নিন। আপনার পরিচিত আলেম কিংবা ইতিপূর্বে হজ করেছেন এমন কারও থেকেও এসব জানতে পারেন। ভালো হয় হজ সংক্রান্ত বই পড়ে নিন। হজযাত্রার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় মালপত্র সঙ্গে নিন।
হজ ক্যাম্পে করণীয়
বাংলাদেশি হজযাত্রীদের শুরুতে আশকোনা হজ ক্যাম্পে যেতে হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় অনেক কাজ থাকে হাজিদের। তাই হজ ক্যাম্পের উদ্দেশে যাত্রার আগে আপনার ভিসা ও টিকেট চেক করে নিন। প্রয়োজনে আপনার এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে যাত্রার তারিখ ও সময় সম্পর্কে পুনরায় নিশ্চিত হয়ে নিন। নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে হজ ক্যাম্পে পৌঁছান। মুয়াল্লিম ও কাফেলার সঙ্গে সমন্বয় করে যাত্রা শুরু করুন। ব্যাগেজে যে মালপত্র দেবেন, তা ঠিকমতো বাঁধা হয়েছে কি না দেখে নিন। বিমানের কাউন্টারে মাল রাখার পর এর টোকেন যত্ন করে রাখুন। ইমিগ্রেশন, চেকিংয়ের পর আপনার মালপত্র যত্নে রাখুন। আপনার পাসপোর্ট, বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র, বিমানের টিকেট, টাকা, সৌদি রিয়াল, বিমানে পড়ার জন্য ধর্মীয় বইসহ অন্যান্য জরুরি কাগজপত্র গলায় ঝুলানো ব্যাগে সংরক্ষণ করুন। সময়মতো বিমানে উঠে নির্ধারিত আসনে বসুন।
ওমরাহর ইহরাম বাঁধা
আপনার গন্তব্য ঢাকা থেকে মক্কায় নাকি মদিনায়, এজেন্সি থেকে জেনে নিন। মদিনায় হলে বাংলাদেশ থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে না। যখন মদিনা থেকে মক্কায় যাবেন, তখন বাঁধতে হবে। তবে বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ হজযাত্রী শুরুতে মক্কায় যান। আপনার গন্তব্য সরাসরি মক্কায় হলে ঢাকা থেকে বিমানে উঠার আগে ইহরাম বাঁধা ভালো। কারণ জেদ্দা পৌঁছানোর আগেই ‘ইয়ালামলাম’ মিকাত বা ইহরাম বাঁধার নির্দিষ্ট স্থান। বিমানে যদিও ইহরাম বাঁধার কথা বলা হয় কিন্তু ওই সময় অনেকে ঘুমিয়ে থাকেন। তা ছাড়া বিমানে পোশাক পরিবর্তন করাটাও দৃষ্টিকটু। তাই বিমানে উঠার আগেই ইহরাম বেঁধে নেওয়া ভালো। ইহরাম না বেঁধেই মিকাত পার হলে এর জন্য দম (আলাদা কুরবানি) দিতে হবে এবং গুনাহ হবে।
উল্লেখ্য, ইহরামের সময় মূল বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে আপনি কী হজ করবেন- হজ্জে তামাত্তু, কিরান নাকি ইফরাদ? বাংলাদেশ থেকে যারা যান, তারা সাধারণত তামাত্তু তথা প্রথমে ওমরাহ, তারপর হজ করেন। আপনিও যদি হজ্জে তামাত্তু করতে চান, তা হলে আপনাকে ইহরাম বাঁধতে হবে ওমরাহর নিয়ত করে। মক্কায় পৌঁছে ওমরাহ পালন শেষে ৮ জিলহজ হোটেল বা হারাম শরিফ থেকে ফের যে ইহরাম বাঁধবেন সেটি হবে আপনার হজের ইহরাম।
ইহরাম কী?
ইহরাম হলো পুরুষ সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় আর নারী যেকোনো শালীন পোশাক পরে হজ বা ওমরাহর নিয়ত করে কমপক্ষে একবার ‘তালবিয়া’ পড়া। তিনবার পড়া উত্তম। তালবিয়া হলো- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননিমাতা লাকা ওয়াল-মুলক, লা-শারিকা লাক।’ অনেকে শুধু শুভ্র ইহরামের কাপড় পরিধান করাকেই ইহরাম মনে করেন। এটা ভুল ধারণা। ইহরামে ‘নিয়ত’ ও ‘তালবিয়া’ পাঠ আবশ্যক।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
ইহরাম বাঁধার পর বেশ কিছু কাজ করা নিষেধ। যেমন- ১. পুরুষরা সেলাইযুক্ত কোনো কাপড় পরিধান করা। পায়ের পাতা ঢাকে এমন জুতা বা স্যান্ডেল পরা। অবশ্য মহিলারা স্বাভাবিক কাপড় ও জুতা-মোজা পরতে পারবে। ২. পুরুষরা মাথা ও মুখমণ্ডল ইহরামের কাপড় বা যেকোনো কাপড় অথবা টুপি দ্বারা ঢেকে রাখা। মহিলারা মাথা ঢেকে রাখবে আর মুখমণ্ডল খোলা রাখবে। ৩. চুল কাটা বা ছিঁড়ে ফেলা। ৪. নখ কাটা। ৫. ঘ্রাণযুক্ত তেল বা আতর ব্যবহার করা। ৬. স্ত্রী মিলন করা। ৭. যৌন উত্তেজনামূলক কোনো আচরণ বা কথা বলা। ৮. শিকার করা। ৯. ঝগড়া-বিবাদ করা। ১০. চুল ও দাড়িতে চিরুনি বা আঙুল চালানো (কারণ তাতে চুল বা দাড়ি ছেঁড়ার আশঙ্কা থাকে)। ১১. শরীরে সুগন্ধি সাবান প্রভৃতি লাগানো। ১২. উকুন, ছারপোকা, মশা ও মাছিসহ কোনো জীবজন্তু হত্যা। ১৩. কোনো গুনাহের কাজ করা। ইহরাম অবস্থায় এসব নিষিদ্ধ।
জেদ্দা বিমানবন্দরে লক্ষণীয়
মুয়াল্লিমের গাড়ি আপনার জন্য জেদ্দা হজ টার্মিনালে অপেক্ষা করবে। সেখান থেকে তারা আপনাকে মক্কায় যে বাড়িতে থাকবেন, সেখানে নামিয়ে দেবে। মুয়াল্লিমের নম্বর (আরবি ও ইংরেজিতে লেখা) হ্যান্ড বেল্ট দেওয়া হবে, তা হাতে পরে নেবেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র (যাতে পিলগ্রিম নম্বর, আপনার নাম, ট্রাভেল এজেন্সির নাম ইত্যাদি থাকবে) গলায় ঝুলাবেন। জেদ্দা থেকে মক্কায় পৌঁছাতে ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। কখনো আরও বেশিও লাগতে পারে। চলার পথে তালবিয়া পড়ুন (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...)।
মক্কায় পৌঁছে
মক্কায় পৌঁছে আপনার থাকার জায়গায় (হোটেল-বাসায়) মালপত্র হেফাজত করুন। ক্লান্ত থাকলে কিছুটা আরাম করুন। নামাজের ওয়াক্ত হলে আদায় করে নিন। এরপর কাফেলার সঙ্গে মিলে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে কাবা ঘরের দিকে এগিয়ে যান। মসজিদুল হারাম অর্থাৎ কাবা শরিফে অনেক প্রবেশপথ আছে। আগে থেকেই ঠিক করুন, কোন প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকবেন বা বের হবেন। অবশ্য আপনার মুয়াল্লিম বা এজেন্সির প্রতিনিধিরা শুরুতে আপনাকে এসব বিষয় চিনিয়ে দেওয়ার কথা। সবকিছু পরিচিত হয়ে উঠলে আপনার সফরসঙ্গীকেও চিনতে সহযোগিতা করুন। হারিয়ে গেলে নির্দিষ্ট নম্বরের গেটের সামনে থাকুন। এতে অতিরিক্ত ভিড়ে হারিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সঙ্গীকে খুঁজে পাবেন। কাবা শরিফে স্যান্ডেল-জুতা আলাদা ব্যাগে করে সঙ্গে রাখুন। অতঃপর ধারাবাহিকভাবে বায়তুল্লাহ তওয়াফ, তওয়াফের নামাজ, সাফা-মারওয়া পাহাড় সাঈ এবং মাথার চুল ফেলে ইহরামমুক্ত হোন।
ওমরাহর ফরজ ও ওয়াজিব
মিকাত অতিক্রমের আগেই ইহরাম বেঁধে বায়তুল্লাহ শরিফ তওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়া বা ছোট করাকে ওমরাহ বলে। ওমরাহর ফরজ দুটি। যথা ১. ইহরাম বাঁধা। ২. তওয়াফ করা। ওমরাহর ওয়াজিবও দুটি। যথা- ১. সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে সাতবার সাঈ করা। ২. মাথার চুল মুণ্ডন করা।
হজের প্রকার
তামাত্তু : মিকাত অতিক্রমের আগে শুধু ওমরাহর নিয়তে ইহরাম বেঁধে ওমরাহর আমল সম্পন্ন করে চুল কেটে বা মুণ্ডন করে ইহরামমুক্ত হওয়া। অতঃপর একই সফরে হজের আগমুহূর্তে হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে হজ কার্য সম্পন্ন করা। তামাত্তু হজ পালনকারীর জন্য দমে শোকর বা হজের কুরবানি করা ওয়াজিব।
ইফরাদ : মিকাত অতিক্রমের আগে শুধু হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে সেই ইহরামে হজ সম্পন্ন করা। ইফরাদ হজ পালনকারীর জন্য হজের কুরবানি করা মুস্তাহাব।
কিরান : মিকাত অতিক্রমের আগে একই সঙ্গে ওমরাহ ও হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে ওই একই ইহরামে ওমরাহ ও হজ করা। কিরান হজ পালনকারী মাঝখানে ওমরাহর পর ইহরাম খুলতে পারবেন না। কিরান হজ পালনকারীর জন্যও হজের কুরবানি করা ওয়াজিব। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের হাজিরা সাধারণত তামাত্তু হজ পালন করে থাকেন।
তামাত্তু হজের ১৪ আমল
এক. প্রথমে ওমরাহর ইহরাম বাঁধা।
দুই. মক্কায় গিয়েই ওমরাহর তওয়াফ করা।
তিন. ওমরাহর তওয়াফের পরই এর সাঈ করা।
চার. সাঈর পর মাথা মুণ্ডন করা বা চুল ছাঁটা।
পাঁচ. জিলহজের ৭ বা ৮ তারিখ হজের জন্য ইহরাম বাঁধা।
ছয়. জিলহজের ৯ তারিখ আরাফায় অবস্থান করা।
সাত. ১০ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগপর্যন্ত সময়ের মধ্যে তওয়াফে জিয়ারত করা।
আট. জিলহজের ১০ তারিখ বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারা।
নয়. কুরবানি করা (পাথর মেরে মাথা মুণ্ডন করার আগে)।
দশ. মাথা মুণ্ডন করা।
এগারো. ফরজ তওয়াফ বা তওয়াফে জিয়ারতের সঙ্গে হজের সাঈ করা।
বারো. জিলহজের ১১ তারিখ তিন শয়তানকে (প্রথমে ছোট তারপর মেজ ও শেষে বড়) সাতটি করে মোট ২১টি পাথর মারা।
তেরো. পরের দিন ১২ তারিখ অনুরূপ তিন শয়তানকে সাতটি করে মোট ২১টি পাথর মারা। সব মিলিয়ে তিন দিনে ৭+২১+২১=৪৯টি পাথর নিক্ষেপ করা।
চৌদ্দ. পবিত্র মক্কার বাইরের লোকজন মক্কা থেকে বিদায়ের সময় তওয়াফ করা।
হজের ফরজ ও ওয়াজিব
হজের ফরজ আমল তিনটি- ১. ইহরাম বাঁধা। ২. আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। ৩. তওয়াফে জিয়ারত করা।
হজের ওয়াজিব হলো ছয়টি- ১. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার সাঈ করা। ২. জিলহজের ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্য হলেও মুজদালিফায় অবস্থান করা। ৩. মিনায় জামারাত বা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা। ৪. তামাত্তু ও কিরান হজ পালনকারীদের ক্ষেত্রে হজের কুরবানি করা। ৫. ইহরাম ত্যাগের আগে মাথার চুল মুণ্ডন করা বা ছাঁটা। ৬. পবিত্র মক্কার বাইরের লোকদের জন্য মক্কা থেকে বিদায়কালীন তওয়াফ করা। এ ছাড়া বাকি আমলগুলো সুন্নত ও মুস্তাহাব।
মিনার উদ্দেশে যাত্রা
হজের ইহরাম বাঁধার পর প্রথম দিন (৮ জিলহজ) মক্কা থেকে মিনায় রওনা করতে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করা সুন্নত। জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ৯ জিলহজ ফজর মিলিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ।
আরাফায় অবস্থান
হজের দ্বিতীয় দিন ৯ জিলহজ আরাফায় অবস্থান ফরজ। ফজরের নামাজ মিনায় পড়ে আরাফার ময়দানের দিকে রওনা করতে হয়। প্রয়োজনে ফজরের আগে রাতেও আরাফার উদ্দেশে রওনা হওয়া যায়। সেখানে সূর্য হেলার পর অর্থাৎ ১২টার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করতে হবে। ওয়াক্তমতো তাঁবুতে বা আরাফার ময়দানে (মসজিদে নামিরায় না গেলে) যেকোনো স্থানে জোহর ও আসরের নামাজ নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা। উল্লেখ্য, আরাফার ময়দানে মসজিদে নামিরায় জোহর ও আসরের জামাত এক আজান, দুই ইকামতে একত্রে পরপর আদায় করা হয়।
মুজদালিফায় অবস্থান
সূর্যাস্তের পর সঙ্গে সঙ্গে মাগরিব নামাজ না পড়ে মুজদালিফায় রওনা করতে হবে। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ এক আজান, এক ইকামতে একত্রে আদায় করা ওয়াজিব। জামাতে পড়া উত্তম। মুজদালিফায় অবস্থানের সময় কমপক্ষে ৪৯টি খুব ছোট আকারের কঙ্কর সংগ্রহ করে নিন। কারণ ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ (৪৯টি পাথর) তিন শয়তানকে মারতে হবে। মিস হওয়ার আশঙ্কায় কয়েকটি পাথর বেশি নিয়ে নেওয়া ভালো।
পাথর নিক্ষেপ ও কুরবানি
তৃতীয় দিন ১০ জিলহজে বড় শয়তানকে পাথর মারা, কুরবানি করা, মাথা মুণ্ডন করা ও তওয়াফে জিয়ারত করা হজের মৌলিক বিধান। আরাফায় অবস্থানের (৯ জিলহজ) রাতে মুজদালিফায় ফজরের নামাজ পড়ে সূর্যোদয়ের আগপর্যন্ত অবস্থান করা ওয়াজিব। সূর্যোদয়ের পরপর মিনায় পৌঁছে বড় শয়তানকে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। বড় শয়তানকে পাথর মারার পর তামাত্তু ও কিরান হজকারীদের কুরবানি করা ওয়াজিব। এরপর মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে স্বাভাবিক পোশাক পরিধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কুরবানির আগে ইহরাম খোলা যাবে না। ইফরাদ হজকারীর কুরবানি না করলেও চলবে।
তওয়াফে জিয়ারত
তওয়াফে জিয়ারত হজের তিনটি ফরজের অন্যতম। মক্কায় গিয়ে ওই দিনই (১০ জিলহজ) তওয়াফে জিয়ারত করা সবচেয়ে উত্তম। তওয়াফে জিয়ারতের পর হজের সাঈ করতে হবে। সাঈ শেষে মিনায় গিয়ে রাতযাপন করা সুন্নত।
মিনায় রাতযাপন
১০ জিলহজ কুরবানি, চুল ছাঁটা বা মুণ্ডন করা ও তওয়াফে জিয়ারত না করে থাকলে ১১ জিলহজ তা সম্পন্ন করুন। এদিন মিনায় তিন শয়তানকে ২১টি পাথর মারা ওয়াজিব। মিনায় রাতযাপন সুন্নত। তওয়াফে জিয়ারত ১২ জিলহজের আগের দুদিন না করে থাকলে এদিন সূর্যাস্তের আগে অবশ্যই করতে হবে। এদিন তিন শয়তানকে ২১টি পাথর মেরে সূর্যাস্তের আগেই মিনা ত্যাগ করুন।
তওয়াফ করবেন যেভাবে
তওয়াফ শুরুর আগে তওয়াফের সাত চক্কর গণনার সুবিধার্থে সাত দানার তসবিহ সঙ্গে রাখতে পারেন। প্রতি চক্কর শেষ হলে একটি করে তসবিহর দানা টানুন। যে তাওয়াফের পরে সাঈ আছে সে তওয়াফে আপনার চাদরের ডান অংশকে ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের ওপর রেখে নিন। এরূপ করাকে ‘ইজতেবা’ বলে। পূর্ণ তওয়াফেই এরূপ রাখতে হবে। অবশ্য প্রথম তিন চক্কর বীরত্ব প্রকাশক দৌড়ের ভঙ্গিতে হাঁটতে হবে। একে ‘রমল’ বলে।
তওয়াফ হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু হয়ে মুলতাজেম, কাবা শরিফের দরজা, হাতিমে কাবা হয়ে রুকনে শামি শেষ করে রুকনে ইয়েমেনি অতিক্রম করে আবার হাজরে আসওয়াদে এসে শেষ করা। এভাবে বায়তুল্লাহকে সাতবার প্রদক্ষিণ করা। যখনই হাজরে আসওয়াদের কাছে পৌঁছবেন তখনই তাকবির বলে হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া। প্রত্যেকবার হাজরে আসওয়াদ থেকে প্রদক্ষিণ শুরু করতে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে হাত উঠিয়ে শুরু করা। ভিড়ের কারণে চুম্বন করতে না পারলে ইশারা করে আবার প্রদক্ষিণ শুরু করা। পুরো তওয়াফের সময় কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়া। মাতৃভাষায়ও নিজের মতো করে প্রাণ খুলে প্রার্থনা করতে পারেন।
তওয়াফের নামাজ
সাতবার প্রদিক্ষণ করার পর মাকামে ইবরাহিমের পেছনে (তা সম্ভব না হলে মসজিদে হারামের যেকোনো স্থানে) দুই রাকাত নামাজ সালাতুত তওয়াফের নিয়তে আদায় করা। তারপর কাবা শরিফের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করা।
সাঈ করবেন যেভাবে
জমজম থেকে রওনা হয়ে সাঈর জন্য সাফা পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হওয়া। পাহাড়ের চিহ্নস্বরূপ উঁচু জায়গায় উঠে কাবা শরিফের দিকে তাকিয়ে তিনবার ‘আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে অন্তরের আবেগ অনুযায়ী দোয়া করা। দোয়া শেষ করে স্বাভাবিক গতিতে মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হওয়া। এ সময় আপনার সামনে সবুজ বাতি দেখতে পারবেন। সবুজ বাতির একটু আগে থেকেই ‘রাব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতাল আআজজুল আকরাম’ পড়তে পড়তে পরবর্তী সবুজ বাতির পর পর্যন্ত দ্রুতগতিতে চলা। এরপর স্বাভাবিক গতিতে চলতে চলতে মারওয়া পাহাড়ের সামান্য উঁচুতে উঠে কাবা শরিফের দিকে ফিরে সাফা পাহাড়ের অনুরূপ উভয় হাত উঠিয়ে তিনবার ‘আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে দোয়া করা।
মদিনা মুনাওয়ারায় হাজেরি
হজ সফরে হজের আগে বা পরে মদিনা মুনাওয়ারায় নবীজি (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত ও মসজিদে নববীতে নামাজ আদায়ের দুর্লভ সুযোগ পরম ভক্তি সহকারে কাজে লাগানো। মক্কা শরিফের মতো মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামের ইতিহাসের নিদর্শনগুলো আমাদের ঈমানকে উজ্জীবিত করে। নবী করিম (সা.)-এর রওজা মোবারক ও মসজিদে নববীর মিম্বারের মাঝখানের অংশটুকু ‘রিয়াজুল জান্নাহ’ বা বেহেশতের বাগান। পরম ভক্তি নিয়ে রিয়াজুল জান্নায় নামাজ, তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ পাঠের সৌভাগ্য লাভের চেষ্টা করা।
পরিশেষে
হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান পালন করতে পারা নিঃসন্দেহে আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। এ নেয়ামত সবার ভাগ্যে জোটে না। আমরা যারা এ নেয়ামতের ভাগীদার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছি আমাদের উচিত হজের পুরো সময়টা রুটিন করে আমলে আমলে কাজে লাগানো। বিশেষ করে মিনা, আরাফা ও মুজদালিফার দিনগুলো। অনেকে অন্যের দেখাদেখি আমল করে, এমনটা না করে কোনো আলেম বা হজ সংক্রান্ত বই থেকে জেনে আমল করা উচিত। পূর্ণ সফর, বিশেষ করে চলতি পথে কোনো নামাজ যেন কাজা না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা। আল্লাহ আমাদের হজ কবুল করুন।