ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন ছিল আরব সমাজ। ভোগবাদিতা এবং খেয়ালখুশিই ছিল মানুষের যাপিত জীবনের একমাত্র চালিকাশক্তি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আরবদের অন্তরে যে হিংসা ও অহংকারের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে এক রূঢ় ও কণ্টকাকীর্ণ মরুবৃক্ষের রূপ ধারণ করেছিল। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তারা পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতো, একে অন্যের রক্তপাতে মেতে উঠত। ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধের প্রকৃত অর্থ কী তা যেন তারা ভুলেই গিয়েছিল। ঠিক এমন এক ক্রান্তিলগ্নে আল্লাহর হাবিব (সা.) তাদের সামনে নিয়ে আসেন আলোর বার্তা, ঈমানের সুপথ। তারা দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হলেন। এর পরের ইতিহাস হলো সোনালি সুদিন ও ভ্রাতৃত্ববোধের অনুপম উপমায় উদ্ভাসিত এক অধ্যায়। তাদের ভ্রাতৃত্ব কেবল মুখের বুলি কিংবা বাহ্যিক কোনো সামাজিক শিষ্টাচার ছিল না, বরং তা ছিল অবিচল ইমানের এক অনিবার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ আমরা পরম ভক্তি ও মহব্বতের সঙ্গে তাদের সেই সোনালি দিনগুলোকে স্মরণ করি।
সাহাবিরা পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধের যে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তার দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত মানব ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। জাহেলি যুগের চরম শত্রুতা ও ভেদাভেদ ভুলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা একে অপরকে নিজের সহোদর ভাইয়ের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলেন। বিশেষ করে হিজরতের পর আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে যে আত্মিক বন্ধন ও সহমর্মিতা গড়ে উঠেছিল তা বিশ্ব ইতিহাসের এক প্রোজ্জ্বল ও চিরভাস্বর দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
একজন আনসারি সাহাবি ক্ষুধার যাতনায় কাতর এমন একজন ভাইকে নিয়ে তার বাড়িতে গেলেন। বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে বললেন, আমার ভাইয়ের জন্য খাবার তৈরি করো। স্ত্রী বললেন, আমার কাছে বাচ্চাদের জন্য রাখা সামান্য খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই। সাহাবি বললেন ঠিক আছে, তুমি খাবার প্রস্তুত করো। বাতি জ্বালিয়ে দাও। বাচ্চারা যখন রাতের খাবার চাইবে, তখন তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেবে। মেহমান যখন খাবার খেতে যাবে, তখন ঠিক করার ভান করে বাতিটি নিভিয়ে দেবে। তার সামনে অন্ধকারে আমরা খাওয়ার ভান করব। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব করা হলো। মেহমান যখন খেতে যাবেন তখন সাহাবির স্ত্রী বাতি নিভিয়ে দিলেন। মেহমান বুঝলেন তাঁর মেজবানও খাচ্ছে। তিনিও খেলেন। মূলত তাঁরা অন্ধকারে খাওয়ার অভিনয় করেছিলেন। পরিবারের সবাই সেই রাতটি ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। পরদিন সকালবেলা সেই সাহাবি উপস্থিত হলেন রাসুল (সা.)-এর দরবারে। রাসুল (সা.) তাঁকে দেখে বললেন, ‘তোমাদের দুজনের এ আমলে আল্লাহ তায়ালা মুগ্ধ হয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি : ৩৭৯৮)।
আরেক সাহাবি সাদ ইবনে রবি (রা.)। তিনি নিজের ধনসম্পদ ও সহায়-সম্বল যেভাবে নবাগত ভাইয়ের সামনে নিঃসংকোচে অর্ধেক তুলে দেওয়ার অভূতপূর্ব প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা বিশ্বমানবতার সামনে ভ্রাতৃত্ববোধের অমূল্য সবক। সাদ ইবনে রবি (রা.) ছিলেন মদিনার আনসার সাহাবি আর আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করা মুহাজির সাহাবি। সাদ (রা.) আবদুর রহমান (রা.)-কে নিয়ে নিজ ঘরে গেলেন। এরপর তাঁকে সম্বোধন করে বললেন, ভাই আবদুর রহমান! আজ থেকে আমার অর্ধেক সম্পদের মালিক তুমি। আর শুনো, আমার দুজন স্ত্রী রয়েছে, একজনকে আমি তোমাকে দিয়ে দেব (উদ্দেশ্য হলো সাদ ইবনে রবি (রা.)-এর একজন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবে, ইদ্দত শেষ হলে আবদুর রহমান (রা.) তাকে বিয়ে করবে)।
এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের সম্প্রীতি ও ভাইয়ের প্রতি আন্তরিকতা। এ কথা শুনে, আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) বললেন, ভাই সাদ! আল্লাহ তোমার সম্পদ ও পরিবারে বরকত দান করুন; তোমার সবকিছু তোমার কাছেই থাকুক। আমাকে শুধু বাজারের রাস্তা দেখিয়ে দাও। আমি ব্যবসা করতে চাই। তাঁকে বাজার দেখিয়ে দেওয়া হলো। তিনি বাজারে গিয়ে কেনাবেচা শুরু করলেন। কিছু লাভ হলে তা দিয়ে ঘি-মাখন কিনে আনলেন। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার উন্নতিও বাড়ে। তিনি সচ্ছল হয়ে উঠলেন। এরপর একজন আনসারি নারীকে বিয়ে করলেন। (মুসনাদে আহমাদ : ১৩৮৬৩)।
আজ আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? সেদিনের সেই সোনালি যুগের সোনার মানুষের জীবনের সঙ্গে যদি আমাদের বর্তমান সমাজের তুলনা করি, তবে কেবল দীর্ঘশ্বাসই বেরিয়ে আসে। সামান্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব, হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে আজ সহোদর ভাইয়ের মধ্যেও দূরত্ব তৈরি হয়, একে অপরকে সহ্য করতে পারি না।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া রিয়াজুল উলূম, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
সময়ের আলো/এসএকে