দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলের কাছেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী এমন ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দেশটি কখনোই পরিষ্কার কোনো উত্তর দেয়নি। এমনকি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকেও খুব একটা চাপের মুখোমুখি হতে হয় না ইসরাইলকে।
গত ১০ মাসে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে দুটি যুদ্ধ চালিয়েছে। সামরিক মানদণ্ডে বিশ্বের এ দুই ক্ষমতাধর দেশের পক্ষ থেকে প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হয়েছে- ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে ছিল। গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘর্ষ এবং চলতি বছরের এক মাসব্যাপী লড়াইয়ে ইরানে ২ হাজার ৬০০-এর বেশি প্রাণহানি হয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে বিশ্ব এখন মুখোমুখি এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটময় পরিস্থিতির।
এ বৈষম্যকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বৈত মানদণ্ড। পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করেন এমন বিশ্লেষকরাও একই প্রশ্ন তুলেছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান ও ইসরাইলের প্রতি ভিন্ন আচরণ শুধু পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) মতো আন্তর্জাতিক কাঠামোয় নয়, বরং প্রতিফলিত হয়েছে বৈশ্বিক রাজনীতি ও শক্তির ভারসাম্যেও।
ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র : বিশ্লেষকরা ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করলেও এ বিষয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি, যা এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’। পারমাণবিক সক্ষমতা কিংবা অস্ত্র বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ২০১৮ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘সবসময় বলেছি, আমরা কখনোই এটি (পারমাণবিক অস্ত্র) প্রথমে ব্যবহার করব না এবং আমরা করিনি...এটুকুই উত্তর হিসেবে যথেষ্ট।’
নানা সময়ে পরমাণু অস্ত্র বিষয়ক প্রশ্নের বিপরীতে ইসরাইলের পক্ষ থেকে ধোঁয়াশাপূর্ণ উত্তরই পাওয়া গেছে। তবু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১৯৫০-এর দশকে দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়নের সময় থেকে ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। শুরুর ওই সময়ে ফ্রান্সসহ আরও অন্যান্য বিদেশি সহায়তা পায় দেশটি।
সন্দেহ করা হয়, নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ডিমোনা পারমাণবিক স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র তৈরির জন্য প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইসরাইলের কাছে ৮০ থেকে ২০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। যদিও সঠিক সংখ্যা এখনও অজানাই রয়ে গেছে।
১৯৮৬ সালে টেকনিশিয়ান মরদেখাই ভানুনু ডিমোনা কেন্দ্রের গোপন তথ্য ও ছবি ফাঁস করলে ইসরাইলের ‘গোপন থাকার’ নীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র সানডে টাইমস ওই ছবি ও তথ্য প্রকাশ করেছিল। ভানুনু পরে ইসরাইলি এজেন্টদের হাতে অপহৃত হন। গোপনে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার পর ১৮ বছর কারাভোগ করেন।
এখনও এনপিটি চুক্তিতে সই না করায় ইসরাইলে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন করার অধিকার নেই কারও। ১৯৭০ সাল থেকে প্রবর্তিত এই চুক্তিটির উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ, নিরস্ত্রীকরণ ও পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯১টি দেশ এতে সই করেছে, যার মধ্যে ইসরাইলের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানও রয়েছে।
কনস্টেলেশন ইনস্টিটিউটের অ্যাস্ট্রা ফেলো বিশ্লেষক শন রস্টকারের মতে, ইসরাইলের এমন ‘নীতি’ একই সঙ্গে একাধিক উদ্দেশ্য পূরণে দেশটিকে সাহায্য করে। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, যুক্তিটা বেশ সহজ- প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে এবং একই সঙ্গে প্রকাশ্যে স্বীকারের পর যেসব কূটনৈতিক, আইনি ও রাজনৈতিক চাপ আসতে পারে তা এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই এই অস্পষ্টতা। বিশেষ করে যখন ইসরাইল এনপিটি চুক্তির অংশ না হওয়ায় পুরো কাঠামোর বাইরে অবস্থান করছে। এই বিশ্লেষকের মতে, নিকট ভবিষ্যতে ইসরাইলের এনপিটিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও কম।
দশকের পর দশক ধরে ইসরাইলের অবস্থান তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশের সঙ্গে জড়িত। এই অস্পষ্টতা পরিত্যাগ করা কিংবা এনপিটিতে যোগ দেওয়ার মধ্যে তাদের কৌশলগত কোনো সুবিধা নেই বললেই চলে, বলেন রস্টকার। তিনি আরও বলেন, বাস্তব কোনো পরিবর্তন করতে হলে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। সেটা হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত অঞ্চলে পরিণত করার উদ্যোগ কিংবা চলমান ‘হুমকিমূলক পরিবেশের’ ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন। এ ছাড়া শুধু আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি : ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ১৯৫০-এর দশকে রেজা শাহ পাহলভির অধীনে শুরু হলেও ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তা আরও বিস্তৃত হয়। ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, তাদের কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে যেমন- বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা কাজে ব্যবহারের জন্য।
১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে চুক্তি করে ইরান। এরপর থেকে দেশটি শাহ ও ইসলামি, দুই শাসনামলেই সংস্থাটির নিয়মিত তদারকির আওতায় রয়েছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথ সমঝোতায় (জেসিপিওএ) যোগ দেয় ইরান। এতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শন নিশ্চিত করার শর্ত ছিল।
এই চুক্তির অধীনে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ১৫ বছরে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমিত রাখা, সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা কমানো, ২৫ বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক তদারকি নিশ্চিত করার কথা। আইএইএর পরিদর্শকরা প্রতিদিন ইরানের স্থাপনাগুলো পর্যবেক্ষণ করতেন। তাদের মতে, ইরান চুক্তি মেনেই তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপরও এক বছর ইরান শর্ত মেনে চলেছে বলে নিশ্চিত করেছে আইএইএ। পরে ধীরে ধীরে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ইরানের কাছে ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ। তবে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় এই ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দাবি।
ইরান কি আসলেই পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম : দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি করে গেলেও এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি। ২০২৫ সালের মার্চে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড কংগ্রেসে বলেছিলেন, ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা খামেনির পক্ষ থেকে ২০০৩ সালে স্থগিত করা পরমাণু অস্ত্র তৈরি কর্মসূচি পুনরায় চালুর অনুমোদনও দেওয়া হয়নি।’
ইরানও বারবার বলেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। ২০০৩ সালে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রকাশ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেছিলেন, ইসলাম এটিকে সমর্থন করে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। এ হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন খামেনি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সবশেষ যুদ্ধ শুরুর পর কংগ্রেসে নতুন করে দেওয়া সাক্ষ্যে গ্যাবার্ড বলেছিলেন, ‘২০২৫ সালের জুনে বোমা হামলার পর ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করেছে- যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন বিশ্বাস করে না।’
ইসরাইল ও ইরানের ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড : বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, এখানে স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড রয়েছে। ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশ্লেষক আহমেদ নাজার তাদের মধ্যে অন্যতম। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থই এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
নাজার মনে করেন, পশ্চিমা ‘মিত্র’ হওয়ায় ইসরাইল আন্তর্জাতিক চাপ থেকে অনেকটাই মুক্ত। আর ‘প্রতিপক্ষ’ বিবেচিত হওয়ায় ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা হয়। এই অর্থে, আন্তর্জাতিক নীতিমালা বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়, আবার কখনো নীরবে উপেক্ষা করা হয়, বলেন তিনি। রাজনৈতিকভাবে দ্বৈত মানদণ্ড এড়িয়ে গেলেও ইসরাইলের দীর্ঘদিনের ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ নীতি সামগ্রিকভাবে আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে বলে মনে করেন নাজার।
তিনি আরও বলেন, অস্পষ্টতা শুধু সক্ষমতা নিয়ে নয়, ব্যবহারের সীমা নিয়েও রয়েছে। আর বাস্তবতা হলো- অন্যদের ক্ষেত্রে যে জবাবদিহিতার চিত্র দেখা যায়, ইসরাইল প্রসঙ্গে সেটি অনুপস্থিত। নাজার বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে ‘বৃহত্তর পরিবর্তন’ ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তনের কোনো আশা বা সম্ভাবনা নেই। যতদিন কৌশলগত স্বার্থ আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে, ততদিন ইসরাইলের পারমাণবিক অবস্থান বড় পরিসরে পর্যালোচনার বাইরেই থেকে যাবে।