মরণনেশা ইয়াবা যেন অপ্রতিরোধ্য। কঠোর অভিযান সত্ত্বেও থামছেই না ইয়াবার বিস্তার।। এর মধ্যে র্যাব ৩টি বড় ধরনের মাদক উদ্ধারের অভিযান পরিচালনা করে। গত বছরের ১৭ জুলাই আনোয়ারা উপজেলার রায়পুরের দক্ষিণ পরুয়াপাড়ার আনোয়ার মাঝির বাড়ি থেকে ইয়াবাসহ এক নারীকে গ্রেফতার করা হয়। ওই নারীর থেকে এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে দেশে দ্রুতগতিতে ঢুকছে বড় বড় ইয়াবার চালান।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা এখন মাদক পাচারের এক নতুন ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান মাছ ও সারের ট্রলার ব্যবহার করে সাগরপথে আনোয়ারার উপকূলে পৌঁছাচ্ছে এবং কর্ণফুলী টানেল ও অন্যান্য পয়েন্ট ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ট্রানজিট রুটের ব্যবহার এখন বেশ সক্রিয়, যা দেশের নিরাপত্তা ও সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলরা বলেছেন, বর্তমানে ইয়াবার চোরাচালান ব্যাপকহারে বেড়েছে। পাশাপাশি অভিযানে ইয়াবা উদ্ধার ও জড়িতদের আটকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকেই আসছে ইয়াবার চালান। সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার কয়েক ধাপের নজরদারি এড়িয়ে ইয়াবার চালান আসে, যার কিছু অংশ আটক হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। মূলত সীমান্ত ভাগ করা নাফ নদ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবাগুলো টেকনাফ হয়ে সরবরাহ হচ্ছে সারা দেশে। এসব চালান আনা-নেওয়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে প্রশিক্ষিত অপরাধীসহ নারী-শিশুরা। মূলত মিয়ানমারের অসহযোগিতার কারণেই ইয়াবা নির্মূল অনেকটাই কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- এই নতুন রুটের অবাধ ব্যবহার ও পর্যবেক্ষণের দুর্বলতার কারণে ইয়াবা পাচার ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কর্ণফুলী টানেল যেমন নিরাপদ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি ছোট ট্রলার ও জেলেদের আড়ালে এই ব্যবসা চালানো হচ্ছে। এর ফলে পাচারকারীরা সহজে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ এড়াতে সক্ষম হচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে, যা অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলছে।
অভিযান ও গ্রেফতারের পরিসংখ্যান বলছে, বহনকারী ও চালানদাররা গ্রেফতার হলেও গডফাদাররা অধরা থেকে যাচ্ছে। এর ফলে এই বড় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মূল চালকরা চক্রের বাইরে থাকছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বেশ কয়েকবার অভিযান ব্যর্থ বা স্থগিত হয়েছে, যা এই চক্রের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ সৃষ্টি করছে। ফলে ইয়াবা বিস্তারে সমাজে ক্ষতিকর প্রভাব ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় আরও গভীর হচ্ছে।
তবে এর মোকাবিলায় প্রয়োজন হচ্ছে আরও কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ। শুধু বহনকারী ও চালানদারদের গ্রেফতার করলেই হবে না, গডফাদার ও সিন্ডিকেটের মূল চক্রকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদক বন্ধ করতে হলে সবাইকে দায়িত্বশীল এবং অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই ভয়াবহ চক্রকে নির্মূল করতে হবে। সমাজ, রাষ্ট্র ও আইনের একযোগে শক্তিশালী প্রয়াস ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
মাদকের চোরাচালানের মধ্য দিয়ে এর ব্যাপক সংক্রমণও আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা উচিত। ইয়াবার বিস্তারে জনগণ উৎকণ্ঠিত। মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে কঠোরতাই জরুরি। না হয় দেশ আরও বিপর্যয়ে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে আন্তরিক হতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য মাদক তথা ইয়াবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হোক- এটি এখন সময়ের দাবি।
সময়ের আলো/আআ